ভাবমুখে-শ্রীরামকৃষ্ণ-১

ভাবমুখে-শ্রীরামকৃষ্ণ-১

সংসার

  •  নির্জনে মাঝে মাঝে সাধন করে কেউ যদি শুদ্ধাভক্তিলাভ করতে পারে, সংসারে থাকলে তার কোন ভয় নাই৷
  •  কেউ যদি ঈশ্বরলাভ করে সংসারে থাকে, তার কোন ভয় নাই৷
  • মৃত্যুকে সর্বদা মনে রাখা উচিত৷ মরবার পর কিছুই থাকবে না৷ এখানে কতকগুলি কর্ম করতে আসা৷ যেমন পাড়াগাঁয়ে বাড়ি—কলকাতায় কর্ম করতে আসা৷
  • জনক রাজা নির্জনে কত সাধন করেছিলেন, সাধন করলে তবে তো সংসারে নির্লিপ্ত হওয়া যায়৷
  • (কেশবকে) তোমারই ল্যাজ খসেছে, অর্থাৎ তুমি সব ত্যাগ করে সংসারের বাহিরেও থাকতে পার আবার সংসারেও থাকতে পার; যেমন ব্যাঙাচির ল্যাজ খসলে জলেও থাকতে পারে, আবার ডাঙাতেও থাকতে পারে৷
  • জনকাদি সংসারেও কর্ম করেছিলেন৷ ঈশ্বরকে মাথায় রেখে কাজ করতেন৷ নৃত্যকী যেমন মাথায় বাসন করে নাচে৷
  • সংসারে হবে না কেন? ওই সাধুসঙ্গ, কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা, মাঝে মাঝে নির্জনে বাস; একটু বেড়া না দিলে ফুটপাথের চারাগাছ, ছাগল গরুতে খেয়ে ফেলে৷
  • কাম, ক্রোধ, লোভ খারাপ জিনিস বটে, তবে তিনি দিয়েছেন কেন? মহৎ লোক তয়ের করবেন বলে৷ ইন্দ্রিয় জয় করলে মহৎ হয়৷
  • তাঁর মায়াতে বিদ্যাও আছে, অবিদ্যাও আছে৷ অন্ধকারেরও প্রয়োজন আছে, অন্ধকার থাকলে আলোর আরও মহিমা প্রকাশ হয়৷
  • তাঁর জগতে সকলরকম আছে৷ সাধু লোকও তিনি করেছেন, দুষ্ট লোকও তিনি করেছেন, সদ্বুদ্ধি তিনিই দেন, অসদ্বুদ্ধিও তিনিই দেন৷
  • কামিনী-কাঞ্চন ভোগ করতে সকলে যায়; কিন্তু দুঃখ অশান্তিই বেশি৷ সংসার যেন বিশালাক্ষীর দ, নৌকা দহে একবার পড়লে আর রক্ষা নাই৷ সেঁকুল কাঁটার মতো এক ছাড়ে তো আর একটি জড়ায়৷
  • কামিনী-কাঞ্চনই মায়া৷ ওর ভিতর অনেকদিন থাকলে হুঁস চলে যায়—মনে হয় বেশ আছি৷ মেথর গুয়ের ভাঁড় বয়—বইতে বইতে আর ঘেন্না থাকে না৷
  • চৈতন্যদেবের সংসারী ভক্তও ছিল৷ তারা সংসারে নামমাত্র থাকত৷ অনাসক্ত হয়ে থাকত৷
  • বদ্ধজীবেরা ঈশ্বরচিন্তা করে না৷ যদি অবসর হয় তাহলে হয় আবোল-তাবোল ফালতো গল্প করে, নয় মিছে কাজ করে৷ জিজ্ঞাসা করলে বলে, আমি চুপ করে থাকতে পারিনা, তাই বেড়া বাঁধছি৷
  • দুষ্ট লোকের কাছে ফোঁস করতে হয়, ভয় দেখাতে হয়, পাছে অনিষ্ট করে৷ তাদের গায়ে বিষ ঢালতে নাই, অনিষ্ট করতে নাই৷
  • লোকের সঙ্গে বাস করতে গেলেই দুষ্ট লোকের হাত থেকে আপনাকে রক্ষা করবার জন্য একটু তমোগুণ দেখানো দরকার৷ কিন্তু সে অনিষ্ট করবে বলে উল্টে তার অনিষ্ট করা উচিত নয়৷
  • অসাধু, অভক্ত, দুষ্ট লোকের সঙ্গে ব্যবহার চলে না৷ মাখামাখি চলে না৷ কারও সঙ্গে কেবল মুখের আলাপ পর্যন্ত চলে, আবার কারো সঙ্গে তাও চলে না৷ ওইরূপ লোকের কাছ থেকে তফাতে থাকতে হয়৷
  • ঈশ্বর সর্বভূতে আছেন৷ তবে ভাল লোকের সঙ্গে মাখামাখি চলে; মন্দ লোকের কাছ থেকে তফাত থাকতে হয়৷ বাঘের ভিতরেও নারায়ণ আছেন; তা বলে বাঘকে আলিঙ্গন করা চলে না৷
  • তেল হাতে মেখে তবে কাঁঠাল ভাঙতে হয়! তা না হলে হাতে আঠা জড়িয়ে যায়৷ ঈশ্বরে ভক্তিরূপ তেল লাভ করে তবে সংসারের কাজে হাত দিতে হয়৷
  • ঈশ্বরে ভক্তিলাভ না করে যদি সংসার করতে যাও তাহলে আরও জড়িয়ে পড়বে৷ বিপদ, শোক, তাপ—এ-সবে অধৈর্য হয়ে যাবে৷ আর যত বিষয়-চিন্তা করবে ততই আসক্তি বাড়বে৷
  • কচ্ছপ জলে চরে বেড়ায়, কিন্তু তার মন কোথায় পড়ে আছে জানো?—আড়ায় পড়ে আছে৷ যেখানে তার ডিমগুলি আছে৷ সংসারের সব কর্ম করবে, কিন্তু ঈশ্বরে মন ফেলে রাখবে৷
  • মাস্টার—ঈশ্বরে কি করে মন হয়?
    শ্রীরামকৃষ্ণ—ঈশ্বরের নামগুণগান সর্বদা করতে হয়৷ আর সৎসঙ্গ—ঈশ্বরের ভক্ত বা সাধু, এঁদের কাছে মাঝেমাঝে যেতে হয়৷ সংসারের ভিতর ও বিষয়কাজের ভিতর রাতদিন থাকলে ঈশ্বরে মন হয় না৷
  • যারা সংসারে তাঁকে ডাকতে পারে, তারা বীরভক্ত৷ মাথায় বিশ মন বোঝা, তবু ঈশ্বরকে পাবার চেষ্টা করছে৷ এরই নাম বীরভক্ত৷
  • ঈশ্বরলাভের পর সংসারে বেশ থাকা যায়৷ বুড়ী ছুঁয়ে তারপর খেলা কর না৷
  • সব মায়া—আবার মোকদ্দমা!
  • এই সংসারে বালি আর চিনি মিশেল আছে৷ পিঁপড়ের মতো বালি ত্যাগ করে করে চিনিটুকু নিতে হয়৷ যে চিনিটুকু নিতে পারে সেই চতুর৷
  • (বিষয়চিন্তার সঙ্গে ঈশ্বরচিন্তা) একটা মেয়ের ভারী শোক হয়েছিল৷ আগে নৎটা কাপড়ের আঁচলে বাঁধলে,—তারপর, ‘ওগো! আমার কি হল গো’ বলে আছড়ে পড়লো৷ খুব সাবধান, নৎটা না ভেঙে যায়৷
  • সংসারের ভিতর কর্মের মধ্যে থেকে, প্রথমাবস্থায় মন স্থির করতে অনেক ব্যাঘাত হয়৷ ফুটপাতের গাছ; যখন চারা থাকে, বেড়া না দিলে ছাগল-গরুতে খেয়ে ফেলে৷
  • জনক রাজা নির্জনে অনেক তপস্যা করেছিলেন৷ সংসারে থেকেও এক-একবার নির্জনে বাস করতে হয়৷
  • সংসারে ঈশ্বরলাভ হবে না কেন? জনকের হয়েছিল৷
  • মনকে যদি কুসঙ্গে রাখ, তো সেইরকম কথাবার্তা, চিন্তা হয়ে যাবে৷ যদি ভক্তের সঙ্গে রাখ, ঈশ্বরচিন্তা, হরি কথা—এই সব হবে৷
  • মন নিয়ে কথা৷ মনেতেই বদ্ধ, মনেতেই মুক্ত৷ মন যে-রঙে ছোপাবে সেই রঙে ছুপবে৷ যেমন ধোপাঘরের কাপড়৷
  • এক হাতে কর্ম কর, আর এক হাতে ঈশ্বরকে ধরে থাক৷ কর্ম শেষ হলে দুইহাতে ঈশ্বরকে ধরবে৷
  • সত্য বলছি, তোমরা সংসার করছ এতে দোষ নাই৷ তবে ঈশ্বরের দিকে মন রাখতে হবে৷ তা না হলে হবে না৷
  • যদিও সংসারের জ্ঞানীর গায়ে দাগ থাকতে পারে, সে দাগে কোন ক্ষতি হয় না৷ চন্দ্রের কলঙ্ক আছে বটে কিন্তু আলোয় ব্যাঘাত হয় না৷
  • জনক রাজার সভায় একটি ভৈরবী এসেছিল৷ স্ত্রীলোক দেখে জনক রাজা হেঁটমুখ হয়ে চোখ নিচু করেছিলেন৷ ভৈরবী তাই দেখে বলেছিলেন, ‘হে জনক, তোমার এখনও স্ত্রীলোক দেখে ভয়?’
  • তবে সংসারে জ্ঞানীরও ভয় আছে৷ কামিনী-কাঞ্চনের ভিতর থাকতে গেলেই একটু না একটু ভয় আছে৷ কাজলের ঘরে থাকতে গেলে যত সিয়ানাই হও না কেন কালো দাগ একটু না একটু গায়ে লাগবেই৷
  • যদি বল, সংসার আশ্রমের জ্ঞানী আর সন্ন্যাস আশ্রমের জ্ঞানী, এ-দুয়ের তফাত আছে কিনা? তার উত্তর এই যে দুই-ই এক জিনিস৷
  • জনক ভারী বীরপুরুষ৷ দুখানা তরবার ঘুরাতেন৷ একখানা জ্ঞান একখানা কর্ম৷
  • জনক নির্লিপ্ত বলে তাঁর একটি নাম বিদেহ;—কিনা, দেহে দেহবুদ্ধি নাই৷ সংসারে থেকেও জীবন্মুক্ত হয়ে বেড়াতেন৷ কিন্তু দেহবুদ্ধি যাওয়া অতি দূরের কথা! খুব সাধন চাই!
  • নির্জনে জ্ঞানলাভ ভক্তিলাভ করে তবে গিয়ে সংসার করতে হয়৷ দই নির্জনে পাততে হয়৷ ঠেলাঠেলি নাড়ানাড়ি করলে দই বসে না৷
  • জলে(সংসারে) যদি দুধ(মন) রাখতে যাও, দুধে জলে এক হয়ে যাবে৷ তাই নির্জন স্থানে দই পাততে হয়৷ দই পেতে মাখন তুলতে হয়৷ মাখন তুলে যদি জলে রাখ তাহলে মিশবে না; নির্লিপ্ত হয়ে ভাসতে থাকবে৷
  • ভক্তিলাভের পর সংসার করা যায়৷ যেমন হাতে তেল মেখে কাঁঠাল ভাঙলে হাতে আর আঠা লাগে না৷
  • কিন্তু সংসারে নির্লিপ্তভাবে থাকতে গেলে কিছু সাধন করা চাই৷ দিনকতক নির্জনে থাকা দরকার; তা একবছর হোক, ছয়মাস হোক তিনমাস হোক বা একমাস হোক৷ সেই নির্জনে ঈশ্বরচিন্তা করতে হয়৷
  • যে সংসারী ঈশ্বরের পাদপদ্মে ভক্তি রেখে সংসার করে, সে ধন্য, সে বীরপুরুষ৷
  • তিন টান হলে ভগবানকে পাওয়া যায়৷ মায়ের ছেলের উপর টান, সতীর পতির উপর টান, বিষয়ীর বিষয়ের উপর টান৷
  • এই সংসার ধোকার টাটি—স্বপ্নবৎ,—এই বোধ হয়, যখন ‘নেতি’ ‘নেতি’ বিচার করে৷ তাঁর দর্শনের পর আবার ‘এই সংসার মজার কুটি৷’

ভক্তি-ভক্ত 

  • ঈশ্বরেতে শুদ্ধাভক্তি যদি না হয়, তাহলে কোন গতি নাই৷
  • যার ঈশ্বরে আন্তরিক ভক্তি আছে, তার সকলেই বশে আসে—রাজা, দুষ্ট লোক, স্ত্রী৷
  • কোন কামনা নাই তাঁকে ভালবাসি, এটি বেশ৷ এর নাম অহেতুকী ভক্তি৷ টাকা-কড়ি, মান-সম্ভ্রম কিছুই চাই না; কেবল তোমার পাদপদ্মে ভক্তি৷
  • যত তাঁর উপর ভক্তি ভালবাসা আসবে, ততই তোমার কর্ম কমে যাবে৷ গৃহস্থের বউ, পেটে যখন ছেলে হয়—শাশুড়ী তার কর্ম কমিয়ে দেয়৷ যতই মাস বাড়ে, শাশুড়ী কর্ম কমায়৷ দশমাস হলে আদপে কর্ম করতে দেয় না৷
  • পূজা,হোম,যাগযজ্ঞ কিছুই কিছু নয়৷ যদি তাঁর উপর ভালবাসা আসে, তাহলে আর এ-সব কর্মের বেশি দরকার নাই৷ যতক্ষণ হাওয়া পাওয়া না যায়, ততক্ষণই পাখার দরকার; যদি দক্ষিণে হাওয়া আপনি আসে,পাখার কি দরকার?
  • তোমরা সাকার মানো না, তাতে কিছু ক্ষতি নাই; নিরাকারে নিষ্ঠা থাকলেই হল৷ তবে সাকারবাদীদের টানটুকু নেবে৷ মা বলে তাঁকে ডাকলে ভক্তি-প্রেম আরও বাড়বে৷
  • ভক্ত এমন কথা বলতে ইচ্ছা করে না যে ‘আমি ব্রহ্ম৷’
  • ভক্তের ভাব কিরূপ জানো? হে ভগবান, ‘তুমি প্রভু, আমি তোমার দাস’, ‘তুমি মা, আমি তোমার সন্তান’, আবার ‘তুমি আমার পিতা বা মাতা’৷
  • উত্তম ভক্ত বলে, তিনি নিজে এই চতুর্বিংশতি তত্ত্ব—জীবজগৎ হয়েছেন৷ ভক্তের সাধ যে চিনি খায়, চিনি হতে ভালবাসে না৷
  • ভক্তেরা বলে, এই জগৎ ভগবানের ঐশ্বর্য৷ আকাশ, নক্ষত্র, চন্দ্র, সূর্য, পর্বত, সমুদ্র, জীবজন্তু—এ-সব ঈশ্বর করেছেন৷
  • তিনি সর্বভূতে আছেন বটে, কিন্তু ভক্তহৃদয়ে বিশেষরূপে আছেন৷ যেমন কোন জমিদার তার জমিদারির সকল স্থানেই থাকিতে পারে৷ কিন্তু তিনি তাঁর অমুক বৈঠকখানায় প্রায়ই থাকেন, এই লোকে বলে৷
  • ঈশ্বরের নামগুণকীর্তন করা অভ্যাস করলেই ক্রমে ভক্তি হয়৷
  • যখন ভক্তি উন্মাদ হয়, তখন বেদবিধি মানে না৷
  • যখন আরতি হত, কুঠির উপর থেকে চিৎকার করতাম, ‘ওরে কে, কোথায় ভক্ত আছিস আয়৷ ঐহিক লোকদের সঙ্গে আমার প্রাণ যায়!’
  • তিনি ভক্তের জন্য দেহধারণ করে যখন আসেন, তখন তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ভক্তরাও আসে৷ কেউ অন্তরঙ্গ, কেউ বহিরঙ্গ৷ কেউ রসদ্দার৷
  • এই অসুখ হওয়াতে কে অন্তরঙ্গ, কে বহিরঙ্গ, বোঝা যাচ্ছে৷ যারা সংসার ছেড়ে এখানে আছে, তারা অন্তরঙ্গ৷ আর যারা একবার এসে ‘কেমন আছেন মশাই’, জিজ্ঞাসা করে, তারা বহিরঙ্গ৷
  • অধম ভক্ত বলে,..সৃষ্টি আলাদা, ঈশ্বর আলাদা৷ মধ্যম ভক্ত বলে, ..ঈশ্বর অন্তর্যামী৷ তিনি হৃদয়মধ্যে আছেন৷ উত্তম ভক্ত দেখে, তিনি এইসব হয়েছেন৷ তিনিই চতুর্বিংশতি তত্ত্ব হয়েছেন৷
  • নারদ বললেন, ‘রাম! যদি একান্ত আমায় বর দেবে, তো এই বর দাও যেন তোমার পাদপদ্মে আমার শুদ্ধাভক্তি থাকে, আর এই করো যেন তোমার ভুবনমোহিনী মায়ায় মুগ্ধ না হই৷
  • অহল্যা বলেছিল, হে রাম! যদি শূকরযোনিতে জন্ম হয় তাতেও আমার আপত্তি নাই, কিন্তু যেন তোমার পাদপদ্মে শুদ্ধাভক্তি থাকে—আমি আর কিছু চাই না৷
  • আমি মা’র কাছে কেবল ভক্তি চেয়েছিলাম৷
  • ভগবানের নাম করলে মানুষের দেহ-মন সব শুদ্ধ হয়ে যায়৷
  • ভক্ত যে আলো দেখে ছুটে যায়, সে যে মণির আলো৷ মণির আলো খুব উজ্জ্বল বটে, কিন্তু স্নিগ্ধ আর শীতল৷ এ-আলোতে গা পুড়ে না, এ-আলোতে শান্তি হয়, আনন্দ হয়৷
  • যদি ঈশ্বরের পাদপদ্মে একবার ভক্তি হয়, যদি তাঁর নামগুণগান করতে ভাল লাগে, ইন্দ্রিয় সংযমের আর চেষ্টা করতে হয় না৷ রিপুবশ আপনা-আপনি হয়ে যায়৷
  • জ্ঞানীরা বলে, আগে চিত্তশুদ্ধি হওয়া দরকার৷ আগে সাধন চাই, তবে জ্ঞান হবে৷ ……ভক্তিপথেও তাঁকে পাওয়া যায়৷
  • ঠিক পথ জানে না, কিন্তু ঈশ্বরে ভক্তি আছে, তাঁকে জানবার ইচ্ছা আছে—এরূপ লোক কেবল ভক্তির জোরে ঈশ্বরলাভ করে৷
  • শিখরা বলেছিল—ঈশ্বর দয়ালু৷ আমি বললাম, তিনি আমাদের মা-বাপ, তিনি আবার দয়ালু কি? ছেলেদের জন্ম দিয়ে বাপ-মা লালন-পালন করবে না,—তো কি বামুন পাড়ার লোকেরা এসে করবে?
  • ঈশ্বরে কিসে ভক্তি হয়, এই চেষ্টা করো৷ ভক্তিলাভের জন্যই মানুষ হয়ে জন্মেছ৷

ঈশ্বরে ভালবাসা/ব্যাকুলতা

  • ঈশ্বরের প্রতি খুব ভালবাসা না এলে হয় না৷ খুব ভালবাসা হলে তবেই তো চারিদিক ঈশ্বরময় দেখা যায়৷ খুব ন্যাবা হলে তবেই চারিদিক হলদে দেখা যায়৷
  • এই (সাধনলব্ধ) প্রেমের শরীরে আত্মার সহিত রমণ হয়৷ ঈশ্বরের প্রতি খুব ভালবাসা না এলে হয় না৷
  • ঈশ্বরকে ভালবাসতে পারলেই তাঁকে পাওয়া যায়৷
  • তিনি যে আপনার লোক, তাঁকে বলতে হয়, তুমি কেমন, দেখা দাও—দেখা দিতেই হবে—তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ কেন?
  • ঈশ্বরকে ভালবাসা—এইটি জীবনের উদ্দেশ্য; যেমন বৃন্দাবনে গোপ-গোপীরা, রাখালরা শ্রীকৃষ্ণকে ভালবাসত৷ যখন শ্রীকৃষ্ণ মথুরা গেলেন, রাখালেরা তাঁর বিরহে কেঁদে কেঁদে বেড়াত৷
  • ভজনানন্দ, ব্রহ্মানন্দ, এই আনন্দই সুরা; প্রেমের সুরা৷ মানবজীবনের উদ্দেশ্য ঈশ্বরে প্রেম, ঈশ্বরকে ভালবাসা৷ ভক্তিই সার৷ জ্ঞানবিচার করে ঈশ্বরকে জানা বড়ই কঠিন৷
  • তিন টান একত্র হলে তবে তিনি দেখা দেন—বিষয়ীর বিষয়ের উপর, মায়ের সন্তানের উপর, আর সতীর পতির উপর টান৷
  • ব্যাকুলতা হলেই অরুণ উদয় হল৷ তারপর সূর্য দেখা দিবেন৷ ব্যাকুলতার পরই ঈশ্বরদর্শন৷
  • মাস্টার—কী অবস্থাতে তাঁকে দর্শন হয়?
    শ্রীরামকৃষ্ণ—খুব ব্যাকুল হয়ে কাঁদলে তাকে তাঁকে দেখা যায়৷ মাগছেলের জন্য লোকে একঘটি কাঁদে, টাকার জন্য লোকে কেঁদে ভাসিয়ে দেয়, কিন্তু ঈশ্বরের জন্য কে কাঁদছে?
  • তিনি যে আপনার লোক, তাঁকে বলতে হয়, তুমি কেমন, দেখা দাও—দেখা দিতেই হবে—তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ কেন?
  • লোক মাগছেলের জন্য একঘটি কাঁদে, ঈশ্বরের জন্য কে কাঁদছে বল?
  • ব্যাকুল হয়ে সাকারবাদীর পথেই যাও, আর নিরাকারবাদীর পথেই যাও, তাঁকেই(ঈশ্বরকেই) পাবে৷ মিছরির রুটি সিধে করেই খাও, আর আড় করেই খাও; মিষ্ট লাগবে৷
  • মানুষ তো অজ্ঞান, ভুল হতেই পারে৷ একসের ঘটিতে কি চারসের দুধ ধরে? তবে যে পথেই থাকো, ব্যাকুল হয়ে তাঁকে ডাকা চাই৷ তিনি তো অন্তর্যামী—সে আন্তরিক ডাক তিনি শুনবেনই শুনবেন৷
  • রাধাকৃষ্ণ মানো আর আর নাই মানো, এই টানটুকু নাও; ভগবানের জন্য কিসে এইরূপ ব্যাকুলতা হয়, চেষ্টা কর৷ ব্যাকুলতা থাকলেই তাঁকে লাভ করা যায়৷
  • পণ্ডিতেরা কত শ্লোক বলে—’শীর্ণা গোকুলমণ্ডলী!’—এইসব৷…ঈশ্বরকে নির্জনে গোপনে ব্যাকুল হয়ে না ডাকলে, এ-সব কথা ধারণা হয় না৷

 ভাব, মহাভাব, প্রেম

   মধুর (ভাব)—যেমন শ্রীমতীর৷ স্ত্রীরও মধুর ভাব৷ এ-ভাবের ভিতরে সকল ভাবই আছে—শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য৷

   বাৎসল্য (ভাব)—যেমন যশোদার৷ স্ত্রীরও কতকটা থাকে৷ … যশোদা কৃষ্ণ খাবে বলে ননী হাতে করে বেড়াতেন৷

   সখ্য (ভাব)—বন্ধুর ভাব; এস, কাছে এসে বস৷ শ্রীদামাদি কৃষ্ণকে কখন এঁটো ফল খাওয়াচ্ছে, কখন ঘাড়ে চড়ছে৷

দাস্য (ভাব)—যেমন হনুমানের৷ রামের কাজ করবার সময় সিংহতুল্য৷

শান্ত (ভাব)—ঋষিদের ছিল৷ তাদের অন্য কিছু ভোগ করবার বাসনা ছিল না৷ যেমন স্ত্রীর স্বামীতে নিষ্ঠা,—সে জানে আমার পতি কন্দর্প৷

কিন্তু তাঁকে লাভ করতে হলে একটা ভাব আশ্রয় করতে হয়৷ শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য বা মধুর৷

আমার মাতৃভাব৷ দাসীভাবও ভাল৷ বীরভাবে সাধন বড় কঠিন৷ সন্তানভাব বড় শুদ্ধভাব৷

ভাব ভক্তি, এর মানে—তাঁকে ভালবাসা৷ যিনিই ব্রহ্ম তাঁকেই ‘মা’ বলে ডাকছে৷

গঙ্গামায়ীর ভাব হত৷ তার ভাব দেখবার জন্য লোকের মেলা হত৷ ভাবেতে একদিন হৃদের কাঁধে চড়েছিল৷

গঙ্গামায়ী বড় যত্ন করত৷…আমার অবস্থা আর ভাব দেখে, বলত—ইনি সাক্ষাৎ রাধা দেহধারণ করে এসেছেন৷ আমায় ‘দুলালী’ বলে ডাকত।

শ্যামকুণ্ড রাধাকুণ্ড পথে সেই মাঠ, আর গাছপালা, পাখি, হরিণ—এইসব দেখে বিহ্বল হয়ে গেলাম৷ চক্ষের জলে কাপড় ভিজে যেতে লাগল৷ মনে হতে লাগল, ‘কৃষ্ণ রে, সবই রয়েছে কেবল তোকে দেখতে পাচ্ছি না৷’

পাল্কি করে শ্যামকুণ্ড, রাধাকুণ্ডের পথে যাচ্ছি, গোবর্ধন দেখতে নামলাম, গোবর্ধন দেখবামাত্রই একেবারে বিহ্বল, দৌড়ে গিয়ে গোবর্ধনের উপরে দাঁড়িয়ে পড়লুম৷—আর বাহ্যশূন্য হয়ে গেলাম৷

যমুনার তীরে সন্ধ্যার সময় বেড়াতে যেতাম৷ যমুনার চড়া দিয়ে সেই সময় গোষ্ঠ হতে গরু সব ফিরে আসত৷ দেখবামাত্র আমার কৃষ্ণের উদ্দীপন হল, উন্মত্তের ন্যায় আমি দৌড়তে লাগলাম—’কৃষ্ণ কই, কৃষ্ণ কই’ এই বলতে বলতে৷

তবে তীর্থে উদ্দীপন হয় বটে৷ মথুরবাবুর সঙ্গে বৃন্দাবনে গেলাম৷ …কালীয়দমন ঘাট দেখবামাত্রই উদ্দীপন হত—আমি বিহ্বল হয়ে যেতাম৷

যারা অন্তরঙ্গ তারা কেবল এখানেই আসবে৷ নরেন্দ্র, ভবনাথ, রাখাল—এরা আমার অন্তরঙ্গ৷ এরা সামান্য নয়৷

হনুমানের কি ভাব! ধন, মান, দেহসুখ কিছুই চায় না; কেবল ভগবানকে চায়৷ যখন স্ফটিকস্তম্ভ থেকে ব্রহ্মাস্ত্র নিয়ে পালাচ্ছে তখন মন্দোদরী অনেকরকম ফল নিয়ে লোভ দেখাতে লাগল৷…কিন্তু হনুমান ভুলবার ছেলে নয়৷

(মাস্টারকে আসতে দেখে) দেখ, একটা ময়ূরকে চারটার সময় আফিম খাইয়ে দিছিল৷ তার পরদিন ঠিক চারটার সময় ময়ূরটা উপস্থিত—আফিমের মৌতাত ধরেছিল—ঠিক সময়ে আফিম খেতে এসেছে (সকলের হাস্য)৷

এখন তর্ক কর বিচার কর; কিন্তু শেষে হরিনামে গড়াগড়ি দিতে হবে৷

শ্রীমতীর মধুরভাব—ছেনালি আছে৷ সীতার শুদ্ধ সতীত্ব—ছেনালি নাই৷ তাঁরই লীলা৷ যখন যে ভাব৷

বলে, ঈশ্বর বাক্য মনের অতীত—তাঁতে কোন রস নাই—তোমরা প্রেমভক্তিরূপ রস দিয়ে তাঁর ভজনা কর৷ দেখো যিনি রসস্বরূপ, আনন্দস্বরূপ, তাঁকে এইরূপ বলছে৷ এ-লেকচারে কি হবে? এতে কি লোকশিক্ষা হয়?

আমার কি ভাব জানো? আমি খাই-দাই থাকি, আর সব মা জানে৷

একবার তাঁর আনন্দ পেলে বিচারবুদ্ধি পালিয়ে যায়৷ মধুপানের আনন্দ পেলে আর ভনভনানি থাকে না৷

ঈশ্বরের চিন্তা

শিবনাথ (শাস্ত্রী) বলেছিল, ঈশ্বরকে একশোবার ভাবলে বেহেড হয়ে যায়৷ আমি তাকে বললাম, চৈতন্যকে চিন্তা করলে কি অচৈতন্য হয়?

কেউ কেউ মনে করে, বেশি ঈশ্বর ঈশ্বর করলে মাথা খারাপ হয়ে যায়৷ তা নয়৷ এ যে সুধার হ্রদ৷ অমৃতের সাগর৷…এতে ডুবে গেলে মরে না—অমর হয়৷

ঈশ্বরকে কেন দর্শন হয় না?—কামিনী-কাঞ্চন মাঝে আড়াল হয়ে রয়েছে বলে৷

মাস্টার— ঈশ্বরকে কি দর্শন করা যায়?
শ্রীরামকৃষ্ণ—হ্যাঁ, অবশ্য করা যায়৷ মাঝেমাঝে নির্জনে বাস; তাঁর নামগুণগান, বস্তুবিচার—এইসব উপায় অবলম্বন করতে হয়৷

এই মনে নির্জনে ঈশ্বরচিন্তা করলে জ্ঞান বৈরাগ্য ভক্তি লাভ হয়৷ কিন্তু সংসারে ফেলে রাখলে ওই মন নীচ হয়ে যায়৷ সংসারে কেবল কামিনী-কাঞ্চন চিন্তা৷

শিবনাথ বলেছিল, বেশি ঈশ্বরচিন্তা করলে বেহেড হয়ে যায়৷ বলে জগৎ-চৈতন্যকে চিন্তা করে অচৈতন্য হয়৷ বোধস্বরূপ, যাঁর বোধে জগৎ বোধ করছে, তাঁকে চিন্তা করে অবোধ!

বিষয়ের কথা একবারে ছেড়ে দেবে৷ ঈশ্বরীয় কথা বই অন্য কোনও কথা বলো না৷ বিষয়ী লোক দেখলে আসতে আসতে সরে যাবে৷ এতদিন সংসার করে তো দেখলে সব ফক্কাবাজি৷ ঈশ্বরই বস্তু আর সব অবস্তু৷

ঈশ্বরের পাদপদ্ম চিন্তা করলে আমার একটি অবস্থা হয়৷ পরনের কাপড় পড়ে যায়, শিড় শিড় করে পা থেকে মাথা পর্যন্ত কি একটা উঠে৷ তখন সকলকে তৃণজ্ঞান হয়৷

যে ব্যক্তি সদাসর্বদা ঈশ্বরচিন্তা করে, সেই জানতে পারে, তাঁর স্বরূপ কি৷ সে ব্যক্তিই জানে যে ঈশ্বর নানারূপে দেখা দেন৷ নানাভাবে দেখা দেন৷ তিনি সগুণ আবার নির্গুণ৷

তাঁতে মন রাখা৷ আর কি বলব? আর একটু একটু ধ্যান করা৷

যার ঈশ্বরে মন সেই তো মানুষ৷ মানুষ—আর মানহুঁশ৷ যার হুঁশ আছে, চৈতন্য আছে, যে নিশ্চিত জানে, ঈশ্বর সত্য আর সব অনিত্য—সেই মানহুঁশ৷

লোকশিক্ষা ও লোকহিত

   লোকশিক্ষা দেওয়া কঠিন৷ … ভগবানকে দর্শনের পর যদি কেউ তাঁর আদেশ পায়, তাহলে লোকশিক্ষা দিতে পারে৷

   কেউ ডুব দিতে চায় না৷ সাধন নাই, ভজন নাই, বিবেক-বৈরাগ্য নাই, দু-চারটে কথা শিখেই অমনি লেকচার৷

   তাঁকে হৃদয়মন্দিরে আগে প্রতিষ্ঠা কর৷ বক্তৃতা, লেকচার তারপর ইচ্ছা হয় তো কর৷

তোমরা বক্তৃতা দাও সকলের উপকারের জন্য, কিন্তু ঈশ্বরলাভ করে ঈশ্বরদর্শন করে বক্তৃতা দিলে উপকার হয়৷ তাঁর আদেশ না পেয়ে লোকশিক্ষা দিলে উপকার হয় না৷

লোকশিক্ষা দেওয়া কঠিন৷ … ভগবানকে দর্শনের পর যদি কেউ তাঁর আদেশ পায়, তাহলে লোকশিক্ষা দিতে পারে৷

তোমাদের কলকাতার লোকের ওই এক! কেবল লেকচার দেওয়া, আর বুঝিয়ে দেওয়া! আপনাকে কে বোঝায় তার ঠিক নাই! তুমি বুঝাবার কে? যাঁর জগৎ তিনি বুঝাবেন৷

ছাগলের গায়ে ক্ষত থাকলে আর ঠাকুরের সেবা হয় না৷ বলি দেওয়া হয় না৷ ত্যাগী না হলে লোকশিক্ষার অধিকারী হয় না৷ গৃহস্থ হলে কজন তার কথা শুনবে?

প্রচার! ওগুলো অভিমানের কথা৷ মানুষ তো ক্ষুদ্র জীব৷ প্রচার তিনিই করবেন, যিনি চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টি করে এই জগৎ প্রকাশ করেছেন৷ প্রচার করা কি সামান্য কথা?

নিত্যেতে পৌঁছে আবার লীলায় থাকা৷ যেমন ওপারে গিয়ে আবার এপারে আসা৷ লোকশিক্ষা আর বিলাসের জন্য—আমোদের জন্য৷

জ্ঞানী জ্ঞানলাভ করবার পরও বিদ্যামায়া নিয়ে থাকতে পারে—ভক্তি, দয়া, বৈরাগ্য—এই সব নিয়ে থাকতে পারে৷ এর দুটি উদ্দেশ্য৷ প্রথম, লোকশিক্ষা হয়, তারপর রসাস্বাদনের জন্য৷

যে ঈশ্বরদর্শন করে নাই, তার উপদেশ ঠিক ঠিক হয় না৷ একটা কথা যদি ঠিক হল, তো আর একটা গোলমেলে হয়ে যায়৷

তাদের (ব্রাহ্ম) উপাসনার পর বেদীতে বসে লেকচার দিলে৷—লিখে এনেছে৷—পড়বার সময় আবার চারদিকে চায়৷—ধ্যান কচ্ছে, তা এক-একবার আবার চায়!

তাঁকে লাভ না করে লেকচার! তাতে লোকের কি উপকার হবে?

ঋষিরা নিজের নিজের জ্ঞানের জন্য ব্যস্ত ছিলেন৷ নারদাদি আচার্য লোকের হিতের জন্য বিচরণ করে বেড়াতেন৷ তাঁরা বীরপুরুষ৷

কেউ কেউ জ্ঞানলাভের পর লোকশিক্ষার জন্য কর্ম করে, যেমন জনক ও নারদাদি৷ লোকশিক্ষার জন্য শক্তি থাকা চাই৷

ভগবানলাভ হলে অন্তর্দৃষ্টি হয়, কার কি রোগ বোঝা যায়৷ উপদেশ দেওয়া যায়৷

লোকশিক্ষা দেবে তার চাপরাশ চাই৷ না হলে হাসির কথা হয়ে পড়ে৷ আপনারই হয় না, আবার অন্য লোক৷ কানা কানাকে পথ দেখিয়ে যাচ্ছে৷ হিতে বিপরীত৷

তিনি সত্য সত্যই সাক্ষাৎকার হন, আর কথা কন৷ তখন আদেশ হতে পারে৷ সে-কথার জোর কত? পর্বত টলে যায়৷ শুধু লেকচার? দিন কতক লোক শুনবে, তারপর ভুলে যাবে৷ কথা অনুসারে সে কাজ করবে না৷

লোকশিক্ষা দেওয়া বড় কঠিন৷ যদি তিনি সাক্ষাৎকার হন আর আদেশ দেন, তাহলে হতে পারে৷ নারদ শুকদেবাদির আদেশ হয়েছিল৷ শঙ্করের আদেশ হয়েছিল৷

আদেশ না থাকলে ‘আমি লোকশিক্ষা দিচ্ছি’ এই অহংকার হয়৷ অহংকার হয় অজ্ঞানে৷ অজ্ঞানে বোধ হয়, আমি কর্তা৷

ভগবানলাভ হলে অন্তর্দৃষ্টি হয়, কার কি রোগ বোঝা যায়৷ উপদেশ দেওয়া যায়৷

লোকশিক্ষা দেবে তার চাপরাশ চাই৷ না হলে হাসির কথা হয়ে পড়ে৷ আপনারই হয় না, আবার অন্য লোক৷ কানা কানাকে পথ দেখিয়ে যাচ্ছে৷ হিতে বিপরীত৷

তিনি সত্য সত্যই সাক্ষাৎকার হন, আর কথা কন৷ তখন আদেশ হতে পারে৷ সে-কথার জোর কত? পর্বত টলে যায়৷ শুধু লেকচার? দিন কতক লোক শুনবে, তারপর ভুলে যাবে৷ কথা অনুসারে সে কাজ করবে না৷

লোকশিক্ষা দেওয়া বড় কঠিন৷ যদি তিনি সাক্ষাৎকার হন আর আদেশ দেন, তাহলে হতে পারে৷ নারদ শুকদেবাদির আদেশ হয়েছিল৷ শঙ্করের আদেশ হয়েছিল৷

তাঁকে লাভ কর৷ তিনি শক্তি দিলে তবে সকলের হিত করতে পার৷ নচেৎ নয়৷

তোমরা বল “জগতের উপকার করা৷” জগৎ কি এতটুকু গা! আর তুমি কে যে জগতের উপকার করবে?

  বিবেক-বৈরাগ্য

      পাণ্ডিত্য কি লেকচার কি হবে যদি বিবেক-বৈরাগ্য না আসে৷ ঈশ্বর সত্য আর সব অনিত্য; তিনিই বস্তু আর সব    অবস্তু; এর নাম বিবেক৷

   ডুব দিলে কুমির ধরতে পারে,…’হৃদি-রত্নাকরের অগাধ জলে’ কামাদি ছয়টি কুমির আছে৷ কিন্তু বিবেক, বৈরাগ্যরূপ হলুদ মাখলে তারা আর তোমাকে ছোঁবে না৷

      ভক্তিই সার৷ তাঁকে ভালবাসলে বিবেক বৈরাগ্য আপনি আসে৷

শুধু ব্রহ্ম ব্রহ্ম বললে কি হবে, যদি বিবেক-বৈরাগ্য না থাকে? ও তো ফাঁকা শঙ্খধ্বনি৷

শুধু পাণ্ডিত্য হলে কি হবে, যদি ঈশ্বরচিন্তা না থাকে? যদি বিবেক-বৈরাগ্য না থাকে?

সন্ন্যাসীর অবিদ্যা মা মরে যায় আর বিবেক সন্তান হয়৷ অবিদ্যা মা মরে গেলে অশৌচ হয়,—তাই বলে সন্ন্যাসীকে ছুঁতে নাই৷

বিবেক-বৈরাগ্য যদি থাকে, তবে তার কথা শুনতে পারা যায়৷ যারা সংসারকে সার করেছে, তাদের কথা নিয়ে কি হবে!

তীব্র বৈরাগ্য হলে সংসার পাতকুয়া, আত্মীয় কালসাপের মতো, বোধ হয়৷ তখন, ‘টাকা জমাব’, ‘বিষয় ঠিকঠাক করব’, এ-সব হিসাব আসে না৷

বিবেক-বৈরাগ্য লাভ করে সংসার করতে হয়৷

সদসৎ বিচারের নাম বিবেক৷ ঈশ্বরই সৎ, নিত্য বস্তু৷ আর সব অসৎ, অনিত্য; দুদিনের জন্য৷

সংসার -সমুদ্রে কামক্রোধাদি কুমির আছে৷ হলুদ গায়ে মেখে জলে নামলে কুমিরের ভয় থাকে না৷ বিবেক-বৈরাগ্য— হলুদ৷

(ডাক্তার রুদ্রকে) আচ্ছা, এটা তোমার কি মনে হয়? টাকা ছুঁলে হাত বেঁকে যায়৷ নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়! আর যদি আমি গিরো বাঁধি যতক্ষণ না গিরো খোলা হয় ততক্ষণ নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে থাকবে!

সত্য

আর একজন আসে, আমি তার জিনিস খেতে পারি না৷ সে আফিসে কর্ম করে, তার কুড়ি টাকা মাহিনা৷ আর কুড়ি টাকা কি মিথ্যা (Bill) লিখিয়ে পায়৷ মিথ্যা কথা কয় বলে সে এলে বড় কথা কই না৷

সত্যকথা কলির তপস্যা।

আমাদের দেশে পেটমোটা গোঁফওয়ালা অনেক লোক আছে৷ তবু দশ ক্রোশ দূর থেকে ভাল লোককে পাল্কি করে আনে কেন—ধার্মিক সত্যবাদী দেখে৷ তারা বিবাদ মিটাবে৷ শুধু যারা পণ্ডিত, তাদের আনে না৷

মা

হৃদে একহাত ধরে টানে আর গঙ্গামায়ী একহাত ধরে টানে—এমন সময় মাকে মনে পড়ল!—মা সেই একলা দক্ষিণেশ্বরে কালীবাড়ির নবতে৷ আর থাকা হল না৷ তখন বললাম, না, আমায় যেতে হবে!

ব্রহ্ম ও শক্তি অভেদ৷ তাঁকে মা বলে ডাকলে শীঘ্র ভক্তি হয়, ভালবাসা হয়৷

যখন জগত নাশ হয়, মহাপ্রলয় হয়, তখন মা সৃষ্টির বীজ সকল কুড়িয়ে রাখেন৷ গিন্নীর কাছে যেমন ন্যাতা-ক্যাতার হাঁড়ি থাকে, আর সেই হাঁড়িতে গিন্নী পাঁচরকম জিনিস তুলে রাখে৷

যখন সৃষ্টি হয় নাই; চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, পৃথিবী ছিল না; নিবিড় আঁধার; তখন কেবল মা নিরাকারা মহাকালী—মহাকালের সঙ্গে বিরাজ করছিলেন৷

আমি তো বই-টই কিছুই পড়ি নি, কিন্তু দেখ মার নাম করি বলে আমায় সবাই মানে৷ শম্ভু মল্লিক আমায় বলেছিল, ঢাল নাই, তরোয়াল নাই, শান্তিরাম সিং?

মাটিতে পড়ে পড়ে মাকে ডাকতুম, আমি মাকে বলেছিলাম, মা, আমায় দেখিয়ে দাও কর্মীরা কর্ম করে যা পেয়েছে, যোগীরা যোগ করে যা দেখেছে, জ্ঞানীরা বিচার করে যা জেনেছে৷

রোগের কথা মা’কে বলতে পারি না৷ বলতে লজ্জা হয়৷

সাধনা

   ধ্যান করবার সময় তাঁতে মগ্ন হতে হয়৷ উপর উপর ভাসলে কি জলের নিচে রত্ন পাওয়া যায়?

   ওই অবস্থায় ঈশ্বরকথা বই আর কিছু ভালো লাগে না৷ বিষয়ের কথা হচ্ছে শুনলে বসে বসে কাঁদতাম৷

   (রাসমনি) পূজার সময় আসত আর দুই-একটা গান গাইতে বলত৷ গান গাচ্ছি, দেখি যে অন্যমনস্ক হয়ে ফুল বাচ্ছে৷ অমনি দুই চাপড়৷ তখন ব্যস্তসমস্ত হয়ে হাতজোড় করে রইল৷

   সেই উন্মাদ অবস্থায় আর একদিন বরানগরের ঘাটে দেখলাম, জয় মুখুজ্জে জপ করছে, কিন্তু অন্যমনস্ক৷ তখন কাছে গিয়ে দুই চাপড় দিলাম।

   উন্মাদ অবস্থায় লোককে ঠিক ঠিক কথা, হক কথা বলতুম! কারুকে মানতাম না৷ বড়লোক দেখলে ভয় হত না৷

   যখন আমার এই অবস্থা হল, তখন আশ্বিনের ঝড়ের মতো কি একটা এসে কোথায় কি উড়িয়ে লয়ে গেল৷ আগেকার চিহ্ন কিছুই রইল না৷

   আমার এই অবস্থার পর কেবল ঈশ্বরের কথা শুনবার জন্য ব্যাকুলতা হত৷ কোথায় ভাগবত, কোথায় অধ্যাত্ম (রামায়ণ), কোথায় মহাভারত খুঁজে বেড়াতাম৷

অন্তরে কি আছে জানবার জন্য একটু সাধন চাই৷

ঋষিরা কত খাটত৷ সকালবেলা আশ্রম থেকে চলে যেত৷ একলা সমস্ত দিন ধ্যান চিন্তা করত, রাত্রে আশ্রমে ফিরে এসে কিছু ফলমূল খেত৷ দেখা, শুনা, ছোঁওয়া—এ-সবের বিষয় থেকে মনকে আলাদা রাখত, তবে ব্রহ্মকে বোধে বোধ করত৷

নিরাকারে একেবারে মন স্থির হয় না৷ প্রথম প্রথম সাকার তো বেশ৷

সংসার জল আর মনটি যেন দুধ৷ যদি জলে ফেলে রাখ, দুধে-জলে মিশে এক হয়ে যায়, …নির্জনে সাধনা দ্বারা আগে জ্ঞানভক্তিরূপ মাখন লাভ করবে৷ সেই মাখন সংসার-জলে ফেলে রাখলে মিশবে না, ভেসে থাকবে৷

ধ্যান করবে মনে, কোণে ও বনে৷ আর সর্বদা সদসৎ বিচার করবে৷ ঈশ্বরই সৎ—কিনা নিত্যবস্তু, আর সব অসৎ—কিনা অনিত্য৷ এই বিচার করতে করতে অনিত্য বস্তু মন থেকে ত্যাগ করবে৷

মাঝেমাঝে নির্জনে গিয়ে তাঁর চিন্তা করা বড় দরকার৷ প্রথম অবস্থায় মাঝেমাঝে নির্জন না হলে ঈশ্বরে মন রাখা বড়ই কঠিন৷ যখন চারাগাছ থাকে, তখন তার চারিদিকে বেড়া দিতে হয়৷

তাই সর্বদা অভ্যাস করা দরকার৷ তাঁর নামগুণকীর্তন, তাঁর ধ্যান, চিন্তা আর প্রার্থনা—যেন ভোগাসক্তি যায় আর তোমার পাদপদ্মে মন হয়৷

জপ করা কি না নির্জনে নিঃশব্দে তাঁর নাম করা৷ একমনে নাম করতে করতে—জপ করতে করতে—তাঁর রূপদর্শন হয়—তাঁর সাক্ষাৎকার হয়৷

যত এগিয়ে যাবে ততই ভগবানের উপাধি কম দেখতে পাবে৷

যত এগোবে ততই দেখবে তিনিই সব হয়েছেন—তিনিই সব করছেন৷ তিনিই গুরু, তিনিই ইষ্ট৷ তিনিই জ্ঞান, ভক্তি সব দিচ্ছেন৷

সবরকম সাধনা এখানে হয়ে গেছে—জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ, কর্মযোগ৷ হঠযোগ পর্যন্ত—আয়ু বাড়াবার জন্য! এর ভিতরে একজন আছে৷ তা না হলে সমাধির পর ভক্তি-ভক্ত লয়ে কেমন করে আছি৷

যোগ

যোগী বিষয় থেকে মন কুড়িয়ে লয় ও পরমাত্মাতে মন স্থির করতে চেষ্টা করে৷ তাই প্রথম অবস্থায় নির্জনে স্থির আসনে অনন্যমন হয়ে ধ্যানচিন্তা করে৷

যোগীর মন সর্বদাই ঈশ্বরেতে থাকে, সর্বদাই আত্মস্থ৷ চক্ষু ফ্যালফ্যালে, দেখলেই বুঝা যায়৷ যেমন পাখি ডিমে তা দিচ্ছে—সব মনটা সেই ডিমের দিকে, উপরে নামমাত্র চেয়ে রয়েছে৷

মন স্থির না হলে যোগ হয় না৷ সংসার-হাওয়া মনরূপ দীপকে সর্বদা চঞ্চল করছে৷ ওই দীপটা যদি আদপে না নড়ে তাহলে ঠিক যোগের অবস্থা হয়ে যায়৷

নিক্তি, একদিকে ভার পড়লে নিচের কাঁটা উপরের কাঁটার সঙ্গে এক হয় না৷ নিচের কাঁটাটি মন—উপরের কাঁটাটি ঈশ্বর৷ নিচের কাঁটাটি উপরের কাঁটার সহিত এক হওয়ার নাম যোগ৷

যোগীও পরমাত্মাকে সাক্ষাৎকার করতে চেষ্টা করে৷ উদ্দেশ্য—জীবাত্মা ও পরমাত্মার যোগ৷

কি দেখছি জানো? শরীরটা যেন বাঁখারি সাজানো কাপড়মোড়া, সেইটে নড়ছে৷ ভিতরে একজন আছে বলে তাই নড়ছে৷

দেখছি, যখন তাঁতে মনের যোগ হয়, তখন কষ্ট একধারে পড়ে থাকে৷

এখন কেবল দেখছি একটা চামড়া ঢাকা অখণ্ড, আর-একপাশে গলার ঘা-টা পড়ে রয়েছে৷

এই অবস্থা যখন হল ঠিক আমার মতো একজন এসে ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না নাড়ী সব ঝেড়ে দিয়ে গেল৷ ষড় চক্রের এক-একটি পদ্মে জিহ্বা দিয়ে রমণ করে, আর অধোমুখ পদ্ম ঊর্ধ্বমুখ হয়ে উঠে৷ শেষে সহস্রা পদ্ম প্রস্ফূটিত হয়ে গেল৷

ঈশ্বর ও কৃপা

   তাঁকে দেখলে তাঁর ঐশ্বর্য মনে থাকে না৷ ঈশ্বরের আনন্দে মগ্ন হলে ভক্তের আর হিসাব থাকে না৷ নরেন্দ্রকে দেখলে “তোর নাম কি, তোর বাড়ি কোথা”—এ-সব জিজ্ঞাসা করবার দরকার হয় না৷

   আত্মার সাক্ষাৎকার না হলে সন্দেহ ভঞ্জন হয় না৷ তাঁর কৃপা হলে আর ভয় নাই৷ বাপের হাত ধরে গেলেও বরং ছেলে পড়তে পারে, কিন্তু ছেলের হাত যদি বাপ ধরে আর ভয় নাই৷

অহংকার অভিমান থাকলে হয় না৷ ‘আমি’রূপ ঢিবিতে ঈশ্বরের কৃপারূপ জল জমে না, গড়িয়ে যায়৷

মনটি যেন মাটি মাখানো লোহার ছুঁচ—ঈশ্বর চুম্বক পাথর, মাটি না গেলে চুম্বক পাথরের সঙ্গে যোগ হয় না৷

শিখরা ঠাকুরবাড়িতে এসেছিল, তাঁদের মতে অশ্বত্থ গাছে যে পাতা নড়ছে, সেও ঈশ্বরের ইচ্ছায়—তাঁর ইচ্ছা বই একটি পাতাও নড়বার জো নাই৷

দেখ না, আমি তো মুখ্যু, কিছুই জানি না, তবে এ-সব কথা বলে কে? আবার এ-জ্ঞানের ভাণ্ডার অক্ষয়৷…ফুরালেই রাশ ঠেলে৷

এখন বুঝেছি, তাঁর কৃপা হলে জ্ঞানের অভাব থাকে না, মূর্খ বিদ্বান হয়, বোবার কথা ফুটে৷ তাই বলছি, বই পড়লেই পণ্ডিত হয় না৷

তাঁর যদি একবার কৃপা হয়, ঈশ্বরের যদি একবার দর্শনলাভ হয়, আত্মার যদি একবার সাক্ষাৎকার হয়, তাহলে আর কোন ভয় নাই—তখন ছয় রিপু আর কিছু করতে পারবে না৷

ব্রহ্ম-শক্তি-জগত

ব্রহ্ম আর শক্তি অভেদ৷ যেমন অগ্নি আর দাহিকাশক্তি, অগ্নি বললেই দাহিকাশক্তি বুঝা যায়; দাহিকাশক্তি বললেই অগ্নি বুঝা যায়; একটিকে মানলেই আর একটিকে মানা হয়ে যায়৷

যিনিই ব্রহ্ম, তিনিই শক্তি৷ যখন নিষ্ক্রিয় বলে বোধ হয়, তখন তাঁকে ‘ব্রহ্ম’ বলি৷ যখন ভাবি সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় করছেন, তখন তাঁকে আদ্যাশক্তি বলি, কালী বলি৷

রামপ্রসাদ মনকে বলছে—’ঠারে ঠারে’ বুঝতে৷ এই বুঝতে বলছে যে, বেদে যাঁকে ব্রহ্ম বলেছে—তাঁকেই আমি মা বলে ডাকছি৷ যিনিই নির্গুণ, তিনিই সগুণ৷

বিজ্ঞানী দেখে ব্রহ্ম অটল, নিষ্ক্রিয়, সুমেরুবৎ৷ এই জগৎসংসার তাঁর সত্ত্ব রজঃ তমঃ তিন গুণে হয়েছে৷ তিনি নির্লিপ্ত৷

বেদ, পুরাণ, তন্ত্র, ষড় দর্শন—সব এঁটো হয়ে গেছে! মুখে পড়া হয়েছে, মুখে উচ্চারণ হয়েছে—তাই এঁটো হয়েছে৷ কিন্তু একটি জিনিস কেবল উচ্ছিষ্ট হয় নাই, সে জিনিসটি ব্রহ্ম৷

বেদান্তবাদী ব্রহ্মজ্ঞানীরা বলে, সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয়, জীব, জগৎ—এ-সব শক্তির খেলা৷ বিচার করতে গেলে, এ-সব স্বপ্নবৎ; ব্রহ্মই বস্তু আর সব অবস্তু; শক্তিও স্বপ্নবৎ, অবস্তু৷

ব্রহ্মজ্ঞানীর ঠিক ধারণা ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা; নামরূপ এ-সব স্বপ্নবৎ; ব্রহ্ম কি যে, তা মুখে বলা যায় না, তিনি যে ব্যক্তি তাও বলবার জো নাই৷

ব্রহ্ম এ নয়, ও নয়; জীব নয়, জগৎ নয়৷ বিচার করতে করতে যখন মন স্থির হয়, মনের লয় হয়, সমাধি হয়, তখন ব্রহ্মজ্ঞান৷

ব্রহ্মকে ছেড়ে শক্তিকে, শক্তিকে ছেড়ে ব্রহ্মকে ভাবা যায় না৷ নিত্যকে ছেড়ে লীলা, লীলাকে ছেড়ে নিত্য ভাবা যায় না৷

কিন্তু হাজার বিচার কর, সমাধিস্থ না হলে শক্তির এলাকা ছাড়িয়ে যাবার জো নাই৷ ‘আমি ধ্যান করছি’, ‘আমি চিন্তা করছি’—এ-সব শক্তির এলাকার মধ্যে, শক্তির ঐশ্বর্যের মধ্যে৷

যতক্ষণ আমি তুমি আছে, ততক্ষণ নাম-রূপও আছে৷ তাঁরই সব লীলা৷ আমি তুমি যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ তিনি নানারূপে প্রকাশ হন৷

যুগলমূর্তির মানে কি? পুরুষ আর প্রকৃতি অভেদ, তাঁদের ভেদ নাই৷ পুরুষ, প্রকৃতি না হলে থাকতে পারে না; প্রকৃতিও পুরুষ না হলে থাকতে পারে না৷ একটি বললেই আর একটি তার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে হবে৷

দাহিকাশক্তি ছাড়া অগ্নিকে ভাবা যায় না৷ আর অগ্নি ছাড়া দাহিকাশক্তি ভাবা যায় না৷ তাই যুগলমূর্তিতে শ্রীকৃষ্ণের দৃষ্টি শ্রীমতীর দিকে, ও শ্রীমতীর দৃষ্টি কৃষ্ণের দিকে৷

সৃষ্টির পর আদ্যাশক্তি জগতের ভিতরেই থাকেন৷ জগৎ প্রসব করেন, আবার জগতের মধ্যে থাকেন৷

মাকড়সা আর তার জাল৷ মাকড়সা ভিতর থেকে জাল বার করে, আবার নিজে সেই জালের উপর থাকে৷ ঈশ্বর জগতের আধার আধেয় দুই৷

এ অস্তি নাস্তি প্রকৃতির গুণ৷ যেখানে ঠিক ঠিক সেখানে অস্তি নাস্তি ছাড়া৷

ব্রহ্ম কিরূপ জানিস? যেমন বায়ু৷ দুর্গন্ধ, ভাল গন্ধ—সব বায়ুতে আসছে, কিন্তু বায়ু নির্লিপ্ত৷

কি দেখছি জানো? তিনি সব হয়েছেন! মানুষ আর যা জীব দেখছি, যেন চামড়ার সব তয়েরি—তার ভিতর থেকে তিনিই হাত পা মাথা নাড়ছেন!

ব্রহ্ম অলেপ৷ তিন গুণ তাঁতে আছে, কিন্তু তিনি নির্লিপ্ত৷ যেমন বায়ুতে সুগন্ধ-দুর্গন্ধ দুইই পাওয়া যায়, কিন্তু বায়ু নির্লিপ্ত৷

শুদ্ধভক্ত কখনও নিত্যে থাকে, কখন লীলায়৷ যাঁরই নিত্য তাঁরই লীলা৷ দুই কিংবা বহু নয়৷

নিত্য রাধাকৃষ্ণ, আর লীলা রাধাকৃষ্ণ৷ যেমন সূর্য আর রশ্মি৷ নিত্য সূর্যের স্বরূপ, লীলা রশ্মির স্বরূপ৷

ব্রহ্ম—জ্ঞান-অজ্ঞানের পার, পাপ-পুণ্যের পার, ধর্মাধর্মের পার, শুচি-অশুচির পার৷

ব্রহ্ম নির্গুণ৷ তিনি কেবল বোধে বোধ হন৷ মন-বুদ্ধি দ্বারা তাঁকে ধরা যায় না৷

“ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা” এই বিচারের পর সমাধি হলে রূপ-টুপ উড়ে রায়৷ তখন আর ঈশ্বরকে ব্যক্তি বলে বোধ হয় না৷ তিনি কি মুখে বলা যায় না৷ কে বলবে? যিনি বলবেন তিনিই নাই৷

ব্রহ্ম কি তা মুখে বলা যায় না, মুখ বন্ধ হয়ে যায়৷

যখন নিষ্ক্রিয়, সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় করছেন না, তখন তাঁকে ব্রহ্ম বলি, পুরুষ বলি; আর যখন ঐ সব কাজ করেন তখন তাঁকে শক্তি বলি, প্রকৃতি বলি৷

যিনিই পুরুষ তিনিই প্রকৃতি, যিনিই ব্রহ্ম তিনিই শক্তি৷

শক্তি-মায়া

   কন্যা শক্তিরূপা৷ বিবাহের সময় দেখ নাই—বর বোকাটি পিছনে বসে থাকে? কন্যা কিন্তু নিঃশঙ্ক৷

   শক্তিই জগতের মূলাধার৷ সেই আদ্যাশক্তির ভিতরে বিদ্যা ও অবিদ্যা দুই আছে৷ অবিদ্যা—যা মুগ্ধ করে৷ বিদ্যা—যা থেকে ভক্তি, দয়া, জ্ঞান, প্রেম—ঈশ্বরের পথে লয়ে যায়৷

   তিনি মহামায়া৷ জগৎকে মুগ্ধ করে সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় করছেন৷ তিনি অজ্ঞান করে রেখে দিয়েছেন৷ সেই মহামায়া দ্বার ছেড়ে দিলে তবে অন্দরে যাওয়া যায়৷

  তাঁর ইচ্ছা যে খানিক দৌড়াদৌড়ি হয়, তবে আমোদ হয়৷ তিনি লীলায় এই সংসার রচনা করেছেন৷ এরি নাম মহামায়া৷ তাই সেই শক্তিরূপিণী মার শরণাগত হতে হয়৷

   সাধনা করতে করতে তবে কৃপা হয়৷ ছেলে অনেক দৌড়াদৌড়ি কচ্ছে, দেখে মা’র দয়া হয়৷ মা লুকিয়ে ছিল, এসে দেখা দেয়৷

   তাঁকে রাতদিন চিন্তা করলে তাঁকে চারিদিকে দেখা যায়, যেমন—প্রদীপের শিখার দিকে যদি একদৃষ্টে চেয়ে থাক, তবে খানিকক্ষণ পরে চারিদিক শিখাময় দেখা যায়৷

   তাঁকে চর্মচক্ষে দেখা যায় না৷ সাধন করতে করতে একটি প্রেমের শরীর হয়—তার প্রেমের চক্ষু, প্রেমের কর্ণ৷ সেই চক্ষে তাঁকে দেখে, সেই কর্ণে তাঁর বাণী শোনা যায়৷

এই জগতে বিদ্যামায়া অবিদ্যামায়া দুইই আছে; জ্ঞান-ভক্তি আছে আবার কামিনী-কাঞ্চনও আছে, সৎও আছে, অসৎও আছে৷

বন্ধন আর মুক্তি —দুয়ের কর্তাই তিনি৷ তাঁর মায়াতে সংসারী জীব কামিনী—কাঞ্চনে বদ্ধ, আবার তাঁর দয়া হলেই মুক্ত৷ তিনি “ভববন্ধনের বন্ধনহারিণী তারিণী”।

কালী কি কালো? দূরে তাই কালো, জানতে পারলে কালো নয়৷

আদ্যাশক্তি লীলাময়ী; সৃস্টি-স্থিতি-প্রলয় করছেন৷ তাঁরই নাম কালী৷ কালীই ব্রহ্ম, ব্রহ্মই কালী৷

তিনি লীলাময়ী! এ সংসার তাঁর লীলা৷ তিনি ইচ্ছাময়ী, আনন্দময়ী৷ লক্ষের মধ্যে একজনকে মুক্তি দেন৷

এ-ভেদবোধ তাঁরই মায়া—তাঁর মায়ার সংসার চালাবার জন্য বন্দোবস্ত৷ বিদ্যামায়া আশ্রয় করলে, সৎপথ ধরলে তাঁকে লাভ করা যায়৷ যে লাভ করে, যে ঈশ্বরকে দর্শন করে, সেই মায়া পার হয়ে যেতে পারে৷

ঈশ্বরীয় শক্তির কাছে মানুষ কি করবে? অর্জুন কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে বললেন, আমি যুদ্ধ করতে পারব না, জ্ঞাতি বধ করা আমার কর্ম নয়৷ শ্রীকৃষ্ণ বললেন, ‘অর্জুন! তোমায় যুদ্ধ করতেই হবে, তোমার স্বভাব করাবে!’

তাঁর সাক্ষাৎকারের পর আবার দেখে, এই মায়া-জীবজগৎ তিনিই হয়েছেন৷

মা দেখিয়ে দিচ্ছিলেন যে, সবই মায়া৷ তিনি সত্য, আর যা কিছু সব মায়ার ঐশ্বর্য৷

সাধনস্তর

যে সিদ্ধ সে ঈশ্বরকে পেয়েছে বটে, যিনি সিদ্ধের সিদ্ধ তিনি ঈশ্বরের সঙ্গে বিশেষরূপে আলাপ করেছন৷

যিনি সবে পথে উঠছেন তাকে প্রবর্তক বলে৷ যে সাধন-ভজন করছে—পূজা, জপ, ধ্যান, নামগুণকীর্তন করছে—সে ব্যক্তি সাধক৷

বৈষ্ণবরা বলে যে, ঈশ্বরের পথে যারা যাচ্ছে আর যারা তাঁকে লাভ করেছে তাদের থাক থাক আছে—প্রবর্তক, সাধক, সিদ্ধ আর সিদ্ধের সিদ্ধ৷

দেখো, এখন আর বড় ধ্যান-ট্যান করতে হয় না৷ অখণ্ড একেবারে বোধ হয়ে যায়৷ এখন কেবল দর্শন৷

হৃষীকেশের সাধু এসেছিল৷ সে (আমাকে) বললে, কি আশ্চর্য! তোমাতে পাঁচ প্রকার সমাধি দেখলাম!

ঈশ্বরের জন্য প্রাণ আটুবাটু করলে জানবে যে দর্শনের আর দেরি নাই৷ অরুণ উদয় হলে—পূবদিক লাল হলে—বুঝা যায় সূর্য উঠবে৷

দেখলাম, সাকার থেকে সব নিরাকারে যাচ্ছে৷ আর আর কথা বলতে ইচ্ছা যাচ্ছে কিন্তু পারছি না৷ আচ্ছা, ওই নিরাকারে ঝোঁক, —ওটা কেবল লয় হবার জন্য; না?

যারা শিষ্য করে বেড়ায়, তারা হাল্কা থাকের লোক৷ আর যারা সিদ্ধাই অর্থাৎ নানারকম শক্তি চায়, তারাও হাল্কা থাক৷ যেমন গঙ্গা হেঁটে পার হয়ে যাব, এই শক্তি৷ অন্য দেশে একজন কি কথা বলছে, তাই বলতে পারা, এই শক্তি৷

প্রসাদ খাওয়া উঠে গেল!—সত্য-মিথ্যা এক হয়ে যাচ্ছে!—আবার কি দেখছিলাম জান? ঈশ্বরীয় রূপ! ভগবতী মূর্তি—পেটের ভিতর ছেলে—তাকে বার করে আবার গিলে ফেলছে!…আমায় দেখাচ্ছে যে, সব শূন্য৷

ওইরকম হরির লুটের ছেলে—রোগ ভাল করা—এ-সব সিদ্ধাই৷ যারা অতি নিচু ঘর তারাই ঈশ্বরকে ডাকে রোগ ভালর জন্য৷

কর্ম

যে-কটা কর্ম আছে, সে-কটা শেষ হয়ে গেলে নিশ্চিন্ত৷ গৃহিণী বাড়ির রাঁধাবাড়া আর আর কাজকর্ম সেরে যখন নাইতে গেল, তখন আর ফেরে না—তখন ডাকাডাকি করলেও আর আসবে না৷

ফললাভ হলে আর ফুল থাকে না৷ ঈশ্বরলাভ হলে কর্ম আর করতে হয় না৷ মনও লাগে না৷

কর্মত্যাগ করবার জো নাই৷ তাই কর্ম করবে, কিন্তু ফল ঈশ্বরে সমর্পণ করবে৷

উপার্জন করা উদ্দেশ্য নয়৷ ঈশ্বরের সেবা করাই উদ্দেশ্য৷ টাকাতে যদি ঈশ্বরের সেবা হয় তো সে টাকায় দোষ নাই৷

আমি রাজসিক ভাবের আরোপ করতাম—ত্যাগ করবার জন্য৷ সাধ হয়েছিল সাচ্চা জরির পোষাক পরব, আংটি আঙুলে দেব, নল দিয়ে গুড়গুড়িতে তামাক খাব৷

যখন একবার হরি বা একবার রামনাম করলে রোমাঞ্চ হয়, অশ্রুপাত হয়, তখন নিশ্চয়ই জেনো যে সন্ধ্যাদি কর্ম—আর করতে হবে না৷ তখন কর্মত্যাগের অধিকার হয়েছে—কর্ম আপনা-আপনি ত্যাগ হয়ে যাচ্ছে৷

খানিকটা কর্ম ভোগ হয়৷ কিন্তু তাঁর নামের গুণে অনেক কর্মপাশ কেটে যায়৷

হাঁ, তাও (কর্ম) করবে, সংসারযাত্রার জন্য যেটুকু দরকার৷ কিন্তু কেঁদে নির্জনে তাঁর কাছে প্রার্থনা করতে হবে, যাতে ঐ কর্মগুলি নিষ্কামভাবে করা যায়৷

কর্মটুকু শেষ হয়ে গেলে আর না৷ গৃহিণী বাড়ির কাজকর্ম সব সেরে নাইতে গেলে ডাকাডাকি করলেও আর ফেরে না৷

যতক্ষণ কিছু ভোগ বাকি থাকে কি কর্ম বাকি থাকে, ততক্ষণ সমাধি হয় না৷

কর্মফল

ঈশ্বরের নিয়ম যে পাপ করলে তার ফল পেতে হবে৷ লঙ্কা খেলে, তার ঝাল লাগবে না?

বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগরের সব প্রস্তুত কেবল চাপা রয়েছে৷ কতকগুলি সৎকাজ করছে, কিন্তু অন্তরে কি আছে তা জানে না, অন্তরে সোনা চাপা রয়েছে৷ অন্তরে ঈশ্বর আছেন,—জানতে পারলে সব কাজ ছেড়ে ব্যাকুল হয়ে তাঁকে ডাকতে ইচ্ছা হয়৷

(বিদ্যাসাগরকে সহাস্যে) এ-যা বললুম, বলা বাহুল্য আপনি সব জানেন—তবে খপর নাই৷ বরুণের ভাণ্ডারে কত কি রত্ন আছে৷ বরুণ রাজার খপর নাই৷

(বিদ্যাসাগরকে)নিষ্কামকর্ম করতে পারলে ঈশ্বরে ভালবাসা হয়; ক্রমে তাঁর কৃপায় তাঁকে পাওয়া যায়৷ ঈশ্বরকে দেখা যায়, তাঁর সঙ্গে কথা কওয়া যায়, যেমন আমি তোমার সঙ্গে কথা কচ্ছি৷

(বিদ্যাসাগরকে) অন্তরে সোনা আছে, এখনও খবর পাও নাই৷ একটু মাটি চাপা আছে৷ যদি একবার সন্ধান পাও, অন্য কাজ কমে যাবে৷

(বিদ্যাসাগরকে) জগতের উপকার মানুষে করে না, তিনিই করছেন; যিনি চন্দ্র-সূর্য করেছেন, যিনি মা-বাপের স্নেহ, যিনি মহতের ভিতর দয়া, যিনি সাধু-ভক্তের ভিতর ভক্তি দিয়েছেন৷

(বিদ্যাসাগরকে) তুমি যে-সব কর্ম করছ, এ-সব সৎকর্ম৷ যদি ‘আমি কর্তা’ এই অহংকার ত্যাগ করে নিষ্কামভাবে করতে পার, তাহলে খুব ভাল৷ এই নিষ্কামকর্ম করতে করতে ঈশ্বরেতে ভক্তি ভালবাসা আসে… ঈশ্বরলাভ হয়৷

(বিদ্যাসাগরকে) তাঁকে পাণ্ডিত্য দ্বারা বিচার করে জানা যায় না৷

বিদ্যাসাগর—তিনি কি কারুকে বেশি শক্তি, কারুকে কম শক্তি দিয়েছেন?
শ্রীরামকৃষ্ণ—তিনি বিভুরূপে সর্বভূতে আছেন৷ পিঁপড়েতে পর্যন্ত৷ কিন্তু শক্তিবিশেষ৷ … তা নাহলে তোমাকেই বা সবাই মানে কেন? তোমার কি শিং বেরিয়েছে দুটো?

(বিদ্যাসাগরকে) সত্ত্বগুণ থেকে দয়া হয়৷ দয়ার জন্য যে কর্ম করা যায়, সে রাজসিক কর্ম বটে—কিন্তু এ রজোগুণ—সত্ত্বের রজোগুণ, এতে দোষ নাই৷

ধর্ম সমন্বয়

যদি বল, ওদের ধর্মে অনেক ভুল, কুসংস্কার আছে, আমি বলি, তা থাকলেই বা, সকল ধর্মেই ভুল আছে৷ সব্বাই মনে করে আমার ঘড়িই ঠিক যাচ্ছে৷ ব্যাকুলতা থাকলেই হল; তাঁর উপর ভালবাসা, টান থাকলেই হল৷

সব পথ দিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়৷ সব ধর্মই সত্য৷ ছাদে উঠা নিয়ে বিষয়৷ তা তুমি পাকা সিঁড়ি দিয়েও উঠতে পার; কাঠের সিঁড়ি দিয়েও উঠতে পার; বাঁশের সিঁড়ি দিয়েও উঠতে পার; আর দড়ি দিয়েও উঠতে পার৷

আমায় সব ধর্ম একবার করে নিতে হয়েছিল—হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান আবার শাক্ত, বৈষ্ণব, বেদান্ত—এ-সব পথ দিয়েও আসতে হয়েছে৷ দেখলাম, সেই এক ঈশ্বর—তাঁর কাছেই সকলি আসছে—ভিন্ন ভিন্ন পথ দিয়ে৷

সব ধর্ম একবার করে নিতে হয়৷—সব পথ দিয়ে চলে আসতে হয়৷ খেলার ঘুঁটি সব ঘর না পার হলে কি চিকে উঠে?—ঘুঁটি যখন চিকে উঠে কেউ তাকে ধরতে পারে না৷

(প্রতিমা) যদি মাটিরই হয়, সে-পূজাতে প্রয়োজন আছে৷ নানারকম পূজা ঈশ্বরই আয়োজন করেছেন৷ যার জগত তিনিই এ-সব করেছেন—অধিকারীভেদে৷ যার যা পেটে সয়, মা সেইরূপ খাবার বন্দোবস্ত করেন৷

(বুদ্ধ প্রসঙ্গে)এ তাঁরই খেলা,—নূতন একটা লীলা৷ নাস্তিক কেন হতে যাবে! যেখানে স্বরূপকে বোধ হয়, সেখানে অস্তি-নাস্তির মধ্যের অবস্থা৷

বুদ্ধ কি জানো? বোধস্বরূপকে চিন্তা করে করে,—তাই হওয়া,—বোধস্বরূপ হওয়া৷

সাকার-নিরাকার-অবতার

বেদ, পুরাণ, তন্ত্রে এক ঈশ্বরেরই কথা আছে ও তাঁর লীলার কথা; জ্ঞান ভক্তি দুইই আছে৷

সনাতন হিন্দুধর্মে সাকার নিরাকার দুই মানে; নানাভাবে ঈশ্বরের পূজা করে—শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য, মধুর৷

আমি সাকারবাদীর কাছে সাকার, আবার নিরাকারবাদীর কাছে নিরাকার৷

এইটি জেনো যে, নিরাকারও সত্য আবার সাকারও সত্য৷ তোমার যেটি বিশ্বাস, সেইটিই ধরে থাকবে৷

তিনি মানুষ হয়ে—অবতার হয়ে—ভক্তদের সঙ্গে আসেন৷ ভক্তেরা তাঁরই সঙ্গে আবার চলে যায়৷

এর ভিতর দুটি আছেন৷ একটি তিনি—আর একটি ভক্ত হয়ে আছে৷ তারই হাত ভেঙেছিল—তারই এই অসুখ করেছে৷

কিন্তু বিদ্যামায়া থাকলে আবার আসতে হবে৷ অবতারাদি বিদ্যামায়া রাখে৷ একটু বাসনা থাকলেই আসতে হয়, ফিরে ফিরে আসতে হয়৷ সব বাসনা গেলে মুক্তি৷ ভক্তেরা কিন্তু মুক্তি চায় না৷

(অবতার প্রসঙ্গে) যাঁরই নিত্য তাঁরই লীলা৷ তিনি মানুষ হতে পারেন না, এ-কথা জোর করে আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে কি বলতে পারি? আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে এ-সব কথা কি ধারণা হতে পারে? এক সের ঘটিতে কি চার সের দুধ ধরে?

তিনি সাকার, তিনি নিরাকার৷…ঈশ্বরকে লাভ না করতে পারলে এসব বুঝা যায় না৷

অবতার—যিনি তারণ করেন৷ তা দশ অবতার আছে, চব্বিশ অবতার আছে আবার অসংখ্য অবতার আছে৷

বিশ্বাস

কথায় বলে হনুমানের রামনামে এত বিশ্বাস যে, বিশ্বাসের গুণে ‘সাগর লঙ্ঘন’ করলে৷ কিন্তু স্বয়ং রামের সাগর বাঁধতে হল৷

বিশ্বাসের কত জোর তা তো শুনেছ?…রামচন্দ্র যিনি সাক্ষাৎ পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণ, তাঁর লঙ্কায় যেতে সেতু বাঁধতে হল৷ কিন্তু হনুমান রামনামে বিশ্বাস করে লাফ দিয়ে সমুদ্রের পারে গিয়ে পড়ল৷ তার সেতুর দরকার হয় নাই৷

কেবল ‘পাপ’ আর ‘নরক’ এই সব কথা কেন? একবার বল যে, অন্যায় কর্ম যা করেছি আর করব না৷ আর তাঁর নামে বিশ্বাস কর৷

ঈশ্বরের নামে এমন বিশ্বাস হওয়া চাই—’কি, আমি তাঁর নাম করেছি, আমার এখনও পাপ থাকবে! আমার আবার পাপ কি! আমার আবার বন্ধন কি?’

যে ব্যক্তি ‘আমি বদ্ধ’, ‘আমি বদ্ধ’ বার বার বলে, সে শালা বদ্ধই হয়ে যায়! যে রাতদিন ‘আমি পাপী’, ‘আমি পাপী’ এই করে, সে তাই হয়ে যায়৷

মনেতেই বদ্ধ, মনেতেই মুক্ত৷ আমি মুক্ত পুরুষ; সংসারেই থাকি বা অরণ্যেই থাকি, আমার বন্ধন কি? আমি ঈশ্বরের সন্তান; রাজাধিরাজের ছেলে; আমায় আবার বাঁধে কে?

ঈশ্বরকে নিরাকার বলে বিশ্বাস থাকলেও তাঁকে পাওয়া যায়৷ আবার সাকার বলে বিশ্বাস থাকলেও তাঁকে পাওয়া যায়৷ তাঁতে বিশ্বাস থাকা আর শরণাগত হওয়া, এই দুটি দরকার৷

বিশ্বাস যত বাড়বে, জ্ঞানও তত বাড়বে৷ যে গরু বেছে বেছে খায় সে ছিড়িক ছিড়িক করে দুধ দেয়৷ যে গরু শাকপাতা, খোসা, ভুষি, যা দাও, গবগব করে খায়, সে গরু হুড়হুড় করে দুধ দেয়৷

রাধাকৃষ্ণ মানো আর আর নাই মানো, এই টানটুকু নাও; ভগবানের জন্য কিসে এইরূপ ব্যাকুলতা হয়, চেষ্টা কর৷ ব্যাকুলতা থাকলেই তাঁকে লাভ করা যায়৷

জ্ঞান-বিজ্ঞান

‘হে ঈশ্বর, তুমি কর্তা আর এ-সব তোমার জিনিস—বাড়ি, পরিবার, ছেলেপুলে, লোকজন, বন্ধু-বান্ধব—এ-সব তোমার জিনিস—এ-ভাব জ্ঞান থেকে হয়৷

আমি ও আমার এদুটি অজ্ঞান৷ ‘আমার বাড়ি’, ‘আমার টাকা’, ‘আমার বিদ্যা’, ‘আমার এইসব ঐশ্বর্য’—এই যে ভাব এটি অজ্ঞান থেকে হয়৷

ঋষিদের ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছিল৷ বিষয়বুদ্ধির লেশমাত্র থাকলে এই ব্রহ্মজ্ঞান হয় না৷

লুনের পুতুল সমুদ্র মাপতে গিছল৷ কত গভীর জল তাই খপর দেবে৷ খপর দেওয়া আর হল না৷ যাই নামা অমনি গলে যাওয়া৷ কে আর খপর দিবেক?

বেদে আছে — তিনি আনন্দস্বরূপ — সচ্চিদানন্দ৷ শুকদেবাদি এই ব্রহ্মসাগর তটে দাঁড়িয়ে দর্শন স্পর্শন করেছিলেন৷ এক মতে আছে — তাঁরা এ সাগরে নামেন নাই৷ এ সাগরে নামলে আর ফিরবার জো নাই৷

ঈশ্বরই কর্তা আর সব অকর্তা—এর নাম জ্ঞান৷

জ্ঞানীরা যাকে ব্রহ্ম বলে, যোগীরা তাঁকেই আত্মা বলে, আর ভক্তেরা তাঁকেই ভগবান বলে৷

জ্ঞানীরা নিরাকার চিন্তা করে৷ তারা অবতার মানে না৷

যতক্ষণ না লোকটিকে দেখা যায়, ততক্ষণ তার গুণের কথা কওয়া যায়; সে যেই সামনে আসে, তখন ও-সব কথা বন্ধ হয়ে যায়৷ লোকে তাকে নিয়েই মত্ত হয়, তার সঙ্গে আলাপ করে বিভোর হয়, তখন আর অন্য কথা থাকে না৷

অন্তরে বাহিরে, দুই দেখছি৷ অখণ্ড সচ্চিদানন্দ৷ সচ্চিদানন্দ কেবল একটা খোল আশ্রয় করে এই খোলের অন্তরে-বাহিরে রয়েছেন! এইটি দেখছি৷

সংসারী জ্ঞানী কিরকম জানো? যেমন সার্সীর ঘরে কেউ আছে৷ ভিতর বার দুই দেখতে পায়৷

দেখছি—সে-ই কামার, সে-ই বলি, সে-ই হাড়িকাট হয়েছে৷

অজ্ঞান নাশের পর জ্ঞান-অজ্ঞান দুই-ই ফেলে দিতে হয়৷ তখন বিজ্ঞান৷

কাঠে আগুন আছে, অগ্নিতত্ত্ব আছে; এর নাম জ্ঞান৷ সেই কাঠ জ্বালিয়ে ভাত রেঁধে খাওয়া ও খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হওয়ার নাম বিজ্ঞান৷

কলাগাছের খোলা ছাড়িয়ে গেলে মাঝ পাওয়া যায়৷ ..মাঝ কিছু খোলা নয়, খোলাও মাঝ নয়৷ কিন্তু শেষে মানুষ দেখে যে খোলেরই মাঝ, মাঝেরই খোল৷ তিনি চতুর্বিংশতি তত্ত্ব হয়েছেন, তিনিই মানুষ হয়েছেন৷

সর্বভূতে ঈশ্বর আছেন, এর নাম জ্ঞান৷ বিশেষরূপে জানার নাম বিজ্ঞান৷ ঈশ্বরের সহিত আলাপ, তাতে আত্মীয়বোধ, এর নাম বিজ্ঞান৷

নানা জ্ঞানের নাম অজ্ঞান৷ পাণ্ডিত্যের অহংকারও অজ্ঞান৷ এক ঈশ্বর সর্বভূতে আছেন, এই নিশ্চয় বুদ্ধির নাম জ্ঞান৷ তাঁকে বিশেষরূপে জানার নাম বিজ্ঞান৷

অনেকে মনে করে, বই না পড়ে বুঝি জ্ঞান হয় না, বিদ্যা হয় না৷ কিন্তু পড়ার চেয়ে শুনা ভাল, শুনার চেয়ে দেখা ভাল৷ কাশীর বিষয় পড়া, কাশীর বিষয় শুনা, আর কাশীদর্শন অনেক তফাত৷

পায়ে কাঁটা ফুটলে আর-একটি কাঁটা জোগাড় করে আনতে হয়৷ এনে সেই কাঁটাটি তুলতে হয়৷ তোলার পর দুটি কাঁটাই ফেলে দেয়৷ জ্ঞান কাঁটা দিয়ে অজ্ঞান কাঁটা তুলে, জ্ঞান অজ্ঞান দুই কাঁটাই ফেলে দিতে হয়৷

এক-একবার ভাবি দেহটা খোল মাত্র; সেই অখণ্ড (সচ্চিদানন্দ) বই আর কিছু নাই৷ … ভাবাবেশ হলে গলার অসুখটা একপাশে পড়ে থাকে৷

জ্ঞানের দুটি লক্ষণ—শান্ত স্বভাব, আর অভিমান থাকবে না৷

‘নেতি’ ‘নেতি’ করে যেখানে মনের শান্তি হয়, সেইখানেই তিনি৷

আমি/অহংকার

সেব্য-সেবক ভাবই ভাল৷ ‘আমি’ তো যাবার নয়৷ তবে থাক শালা ‘দাস আমি’ হয়ে৷

রাম—হনুমান, তুমি আমায় কিভাবে দেখ? হনুমান বললে, ..যখন ‘আমি’ বলে আমার বোধ থাকে, তখন দেখি, তুমি পূর্ণ, আমি অংশ; তুমি প্রভু, আমি দাস৷..যখন তত্ত্বজ্ঞান হয় তখন দেখি, তুমিই আমি, আমিই তুমি৷

জ্ঞানলাভের পরও আবার কোথা থেকে ‘আমি’ এসে পড়ে৷ স্বপনে বাঘ দেখেছিলে, তারপর জাগলে, তবুও তোমার বুক দুড়দুড় করছে৷ জীবের আমি লয়েই তো যত যন্ত্রণা৷

বিজ্ঞানী কেন ভক্তি লয়ে থাকে? এর উত্তর এই যে, ‘আমি’ যায় না৷ সমাধি অবস্থায় যায় বটে, কিন্তু আবার এসে পড়ে৷

কলিতে অন্নগত প্রাণ, দেহবুদ্ধি যায় না৷ এ-অবস্থায় ‘সোহং’ বলা ভাল নয়৷ সবই করা যাচ্ছে, আবার ‘আমিই ব্রহ্ম’ বলা ঠিক নয়৷

জ্ঞানীর পথও পথ৷ জ্ঞান-ভক্তির পথও পথ৷ আবার ভক্তির পথও পথ৷ জ্ঞানযোগও সত্য, ভক্তিপথও সত্য — সব পথ দিয়ে তাঁর কাছে যাওয়া যায়৷ তিনি যতক্ষণ ‘আমি’ রেখে দেন, ততক্ষণ ভক্তিপথই সোজা৷

তোমার ওরূপ রাঁড়ীপুতী বুদ্ধি কেন? জগতের দুঃখনাশ তুমি করবে? জগৎ কি এতটুকু?..এই জগতের পতি যিনি তিনি সকলের খবর নিচ্ছেন৷ তাঁকে আগে জানা—এই জীবনের উদ্দেশ্য৷

তাঁকে দর্শন করবার পর, তিনি যে আমি রেখে দেন, তাকে বলে পাকা আমি৷

সামান্য আধার হলে গেরুয়া পরলে অহংকার হয়; একটু ত্রুটি হলে ক্রোধ, অভিমান হয়৷

তাঁকে দর্শন করবার পর বালকের স্বভাব হয়৷ ‘বালকের আমি’তে কোন দোষ নাই৷ যেমন আরশির মুখ—লোককে গালাগাল দেয় না৷ পোড়া দড়ি দেখতেই দড়ির আকার, ফুঁ দিলে উড়ে যায়৷

এই ‘বিদ্যার আমি’, ‘ভক্তের আমি’—এতে দোষ নাই৷ ‘বজ্জাত আমি’তে দোষ হয়৷

জ্ঞানী যদি সমাধিস্থ হয়ে চুপ করে থাকে, তাহলে লোকশিক্ষা হয় না৷ তাই শঙ্করাচার্য ‘বিদ্যার আমি’ রেখেছিলেন৷

জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি—এই তিন অবস্থা জ্ঞানীরা উড়িয়ে দেয়৷ ভক্তেরা—এ-সব অবস্থাই লয়—যতক্ষণ আমি আছে ততক্ষণ সবই আছে৷

যতক্ষণ দেহ সত্য বলে বোধ আছে, আমি তুমি আছে, ততক্ষণ সেব্য সেবকভাবই ভাল; আমি সেই, এ-বুদ্ধি ভাল নয়৷

যতক্ষণ না ঈশ্বরদর্শন হয়, যতক্ষণ সেই পরশমণি ছোঁয়া না হয়, ততক্ষণ ‘আমি কর্তা’ এই ভুল থাকবে; আমি সৎ কাজ করেছি, অসৎ কাজ করেছি, এইসব ভেদবোধ থাকবেই থাকবে৷

আলু, বেগুন, পটল এরা জীয়ন্ত নয়, নিজে লাফাচ্ছে না৷ হাঁড়ির নিচে আগুন জ্বলছে, তাই ওরা লাফাচ্ছে৷ জীবের ‘আমি কর্তা’ এই অভিমান অজ্ঞান থেকে হয়৷ ঈশ্বরের শক্তিতে সব শক্তিমান৷

তারপর তাঁকে(রামনারায়ণ ডাক্তার) বললুম, তুমি কি বলছো? তাঁকে তর্ক করে কি বুঝবে! তাঁর সৃষ্টিই বা কি বুঝবে৷ তোমার তো ভারি তেঁতে বুদ্ধি৷

অহংকার না গেলে জ্ঞানলাভ করা যায় না৷ উঁচু ঢিপিতে জল জমে না৷ খাল জমিতে চারিদিককার জল হুড়হুড় করে আসে৷

কামিনী-কাঞ্চনে আসক্তি থাকলেই বিদ্যার অহংকার, টাকার অহকার, উচ্চপদের অহংকার—এইসব হয়৷

এ সব লোককে (অহংকারী) যদি বলা যায় যে, অমুক জায়গায় বেশ একটি সাধু আছে, দেখতে যাবে? তারা অমনি নানা ওজর করে বলে, যাব না৷ আর মনে মনে বলে, আমি এত বড় লোক, আমি যাব?

যার বিদ্যার অহংকার, যার পাণ্ডিত্যের অহংকার, যার ধনের অহংকার, তার জ্ঞান হয় না৷

কাঁচা আমি কি জান? আমি কর্তা, আমি এত বড় লোকের ছেলে, বিদ্বান, আমি ধনবান আমাকে এমন কথা বলে!—এইসব ভাব৷

সমাধির পর কাহারো কাহারো ‘আমি’ থাকে— ‘দাস আমি’, ‘ভক্তের আমি’৷ শঙ্করাচার্য ‘বিদ্যার আমি’ লোকশিক্ষার জন্য রেখে দিয়েছিলেন৷ ‘দাস আমি’, বিদ্যার আমি’, ভক্তের আমি’—এরই নাম ‘পাকা আমি’৷\

যখন জীব বলে, ‘নাহং’ ‘নাহং’ ‘নাহং’ আমি কেহ নই, হে ঈশ্বর! তুমি কর্তা; আমি দাস তুমি প্রভু—তখন নিস্তার; তখনই মুক্তি৷

জ্ঞান বিচারের শেষে সমাধি হলে, আমি-টামি কিছু থাকে না৷ কিন্তু সমাধি হওয়া বড় কঠিন৷ ‘আমি’ কোন মতে যেতে চায় না৷ আর যেতে চায় না বলে, ফিরে এই সংসারে আসতে হয়৷

এই ‘আমি’ তিনিই রেখে দিয়েছেন৷ তাঁর খেলা—তাঁর লীলা৷ এক রাজার চার বেটা৷ রাজার ছেলে৷—কিন্তু খেলা করছে—কেউ মন্ত্রী, কেউ কোটাল হয়েছে, এই সব৷ রাজার বেটা হয়ে কোটাল কোটাল খেলছে৷

মনে করো মহাসমুদ্র—অধঃ ঊর্ধ্ব পরিপূর্ণ৷ তার ভিতর একটি ঘট রয়েছে৷ ঘটের অন্তরে-বাহিরে জল৷ কিন্তু না ভাঙলে ঠিক একাকার হচ্ছে না৷ তিনিই এই আমি-ঘট রেখে দিয়েছেন৷

(রোগ নিরাময় প্রসঙ্গে) এক-একবার বলি, ‘মা, তরবারির খাপটা একটু মেরামত করে দাও’, কিন্তু এরূপ প্রার্থনা কম পড়ে যাচ্ছে; আজকাল ‘আমি’টা খুঁজে পাচ্ছি না৷ দেখছি তিনিই এই খোলটার ভিতরে রয়েছেন৷

আর একটি অবস্থা আছে৷ কিছু সঞ্চয় করবার জো নাই৷…আম পেড়ে নিয়ে আসছি—আর চলতে পারলাম না, দাঁড়িয়ে পড়লাম৷ তারপর সেগুলো একটা ডোবের মতন জায়গায় রাখতে হল—তবে আসতে পারলাম!

তাঁর কথা শুনব না কেন? তিনিই কর্তা৷ ‘আমি’ যতক্ষণ রেখেছেন, তাঁর আদেশ শুনে কাজ করব৷

‘আমি কর্তা’, ‘আমি কর্তা’—এই বোধ থেকেই যত দুঃখ, অশান্তি৷

ঈশ্বর কর্তা, ঈশ্বরই সব করছেন, আমি কিছু করছি না—এ বোধ হলে তো সে জীবন্মুক্ত৷

ত্যাগ

গীতার এই শিক্ষা—হে জীব, সব ত্যাগ করে ভগবানকে লাভ করবার চেষ্টা কর৷ সাধুই হোক, সংসারীই হোক, মন থেকে সব আসক্তি ত্যাগ করতে হয়৷

সংসারে কামিনী-কাঞ্চনে আসক্তি যার ত্যাগ হয়ে গেছে, যে ঈশ্বরেতে ষোল আনা ভক্তি দিতে পেরেছে, সেই গীতার মর্ম বুঝেছে৷ গীতা সব বইটা পড়বার দরকার নাই৷ ‘ত্যাগী’ ‘ত্যাগী’ বলতে পারলেই হল৷

কামিনী-কাঞ্চনের উপর ভালবাসা যদি একেবারে চলে যায়, তাহলে ঠিক বুঝতে পারা যায় যে দেহ আলাদা আর আত্মা আলাদা৷ নারকেলের জল সব শুকিয়ে গেলে মালা আলাদা, শাঁস আলাদা হয়ে যায়৷

পাণ্ডিত্য

শুধু পাণ্ডিত্যে কিছু নাই৷ তাঁকে পাবার উপায়, তাঁকে জানবার জন্যই বই পড়া৷ একটি সাধুর পুঁথিতে কি আছে, একজন জিজ্ঞাসা করলে, সাধু খুলে দেখালে৷ পাতায় পাতায় “ওঁ রামঃ” লেখা রয়েছে, আর কিছুই লেখা নাই৷

যারা শুধু পণ্ডিত শুনতেই পণ্ডিত, কিন্তু তাদের কামিনী-কাঞ্চনে আসক্তি—শকুনির মতো পচা মড়া খুঁজছে৷ আসক্তি অবিদ্যার সংসারে৷

পণ্ডিতের যদি দেখি বিবেক নাই, ঈশ্বরে ভালবাসা নাই, খড়কুটো মনে হয়৷

হিসাব পচে যায়৷ পাণ্ডিত্যের দ্বারা তাঁকে পাওয়া যায় না৷ তিনি শাস্ত্র,—বেদ, পুরাণ, তন্ত্রের—পার৷

বই পড়ে কতকগুলো কথা বলতে পারলে কি হবে? …সিদ্ধি সিদ্ধি মুখে বললে কি হবে? কুলকুচো করলেও কিছু হবে না৷ পেটে ঢুকুতে হবে তবে নেশা হবে৷

(কাটোয়ার বৈষ্ণব তর্ক করিতেছিলেন) তুমি কলকলানি। ছাড়৷ ঘি কাঁচা থাকলেই কলকল করে৷

গুণ ও ঐশ্বর্য

যে বাবুর ঘর-দ্বার নাই, হয়তো বিকিয়ে গেল সে বাবু কিসের বাবু৷ ঈশ্বর ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ৷ সে ব্যক্তির যদি ঐশ্বর্য না থাকত তাহলে আর কে মানত৷

বিজ্ঞানী দেখে, যিনিই ব্রহ্ম তিনিই ভগবান, যিনিই গুণাতীত, তিনিই ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ ভগবান৷ এই জীবজগৎ, মন-বুদ্ধি, ভক্তি-বৈরাগ্য-জ্ঞান— এসব তাঁর ঐশ্বর্য৷

এই জগত তাঁর ঐশ্বর্য৷ কিন্তু ঐশ্বর্য দেখেই সকলে ভুলে যায়, যাঁর ঐশ্বর্য তাঁকে খোঁজে না৷

তমোগুণের আর একটি লক্ষণ—ক্রোধ৷ ক্রোধে দিক-বিদিক জ্ঞান থাকে না

পুরাণে আছে রাবণের রজোগুণ, কুম্ভকর্ণের তমোগুণ, বিভীষণের সত্ত্বগুণ৷ তাই বিভীষণ রামচন্দ্রকে লাভ করেছিলেন৷

তমোগুণের স্বভাব অহংকার৷ অহংকার অজ্ঞান, তমোগুণ থেকে হয়৷

মানুষগুলি দেখতে সব একরকম, কিন্তু ভিন্ন প্রকৃতি৷ কারু ভিতর সত্ত্বগুণ বেশি, কারু রজোগুণ বেশি, কারু তমোগুণ

ঈশ্বরলাভের/জ্ঞানের লক্ষণ

ঈশ্বরলাভ যে হয়েছে, তার লক্ষণ আছে৷ বালকবৎ, জড়বৎ, উন্মাদবৎ, পিশাচবৎ হয়ে যায়…৷ চৈতন্যদেব কখন বালকবৎ, কখনো উন্মাদের ন্যায় নৃত্য করিতেন৷ হাসে, কাঁদে, নাচে, গায়৷

ঈশ্বরলাভের পর ভক্ত নির্লিপ্ত হয়, যেমন পাঁকাল মাছ! পাঁকের ভিতর থেকেও গায়ে পাঁক লেগে থাকে না৷

ঈশ্বরলাভ হলে পাঁচ বছরের বালকের স্বভাব হয়৷ ‘বালকের আমি’ আর ‘পাকা আমি’৷ বালক কোন গুণের বশ নয়৷ ত্রিগুণাতীত৷

পূর্ণজ্ঞানের লক্ষণ আছে৷ বিচার বন্ধ হয়ে যায়৷ যা বললুম, কাঁচা থাকলেই ঘিয়ের কলকলানি৷

ঈশ্বরলাভের কতকগুলি লক্ষণ আছে। যার ভিতর অনুরাগের ঐশ্বর্য প্রকাশ হচ্ছে তার ঈশ্বরলাভের আর দেরি নাই।….অনুরাগের ঐশ্বর্য কি কি? বিবেক, বৈরাগ্য, জীবে দয়া, সাধুসেবা, সাধুসঙ্গ, ঈশ্বরের নামগুণকীর্তন, সত্যকথা–এই সব।…বাবু কোন খানসামার বাড়ি যাবেন, এরূপ যদি ঠিক হয়ে থাকে, খানসামার বাড়ির অবস্থা দেখে ঠিক বুঝতে পারা যায়। প্রথমে বন-জঙ্গল কাটা হয়, ঝুল ঝাড়া হয়, ঝাঁটপাট দেওয়া হয়। বাবু নিজেই সতরঞ্চি, গুড়গুড়ি এইসব পাঁচরকম জিনিস পাঠিয়ে দেন। এইসব আসতে দেখলেই লোকের বুঝতে বাকি থাকে না, বাবু এসে পড়লেন বলে।

আত্ম সমর্পন

আমি অকর্তা৷ তাঁর হাতের যন্ত্র৷

কি ভাল কি মন্দ জানি না; তিনি যা করান তাই করি, যা বলান তাই বলি৷

ঈশ্বরকে আমমোক্তারি দাও না৷ তাঁর উপর সব ভার দাও৷ সৎ লোককে যদি কেউ ভার দেয়, তিনি কি অন্যায় করেন? পাপের শাস্তি দিবেন, কি না দিবেন, সে তিনি বুঝবেন৷

বিল্লির ছা কেবল মিউ মিউ করে৷ কোথায় যাবে কি করবে—কিছুই জানে না৷ মা কখন হেঁসেলে রাখছে—কখন বা বিছানার উপর রাখছে৷ এরূপ ভক্ত ঈশ্বরকে আমমোক্তারি(বকলমা) দেয়৷ আমমোক্তারি দিয়ে নিশ্চিন্ত৷

গুরু

যে-সে লোক গুরু হতে পারে না৷ বাহাদুরী কাঠ নিজেও ভেসে চলে যায়, অনেক জীবজন্তুও চড়ে যেতে পারে৷ হাবাতে কাঠের উপর চড়লে, কাঠও ডুবে যায়, যে চড়ে সেও ডুবে যায়৷

আমার কোন শালা চেলা নাই৷ আমিই সকলের চেলা৷ সকলেই ঈশ্বরের ছেলে, সকলেই ঈশ্বরের দাস—আমিও ঈশ্বরের ছেলে; আমিও ঈশ্বরের দাস৷ চাঁদা মামা সকলেরই মামা৷

মানুষ গুরু মেলে লাখ লাখ৷ সকলেই গুরু হতে চায়৷ শিষ্য কে হতে চায়?

গুরু এক সচ্চিদানন্দ৷ তিনিই শিক্ষা দিবেন৷

আমার তিন কথাতে গায়ে কাঁটা বেঁধে৷ গুরু, কর্তা আর বাবা৷

সাধুসঙ্গ

সাধুসঙ্গ করলে আর একটি উপকার হয়৷ সদসৎ বিচার৷ সৎ—নিত্য পদার্থ অর্থাৎ ঈশ্বর৷ অসৎ অর্থাৎ অনিত্য৷ অসৎপথে মন গেলেই বিচার করতে হয়৷

ভক্ত—সাধুসঙ্গে কি উপকার হয়?
শ্রীরামকৃষ্ণ—ঈশ্বরে অনুরাগ হয়৷ তাঁর উপর ভালবাসা হয়৷ ব্যাকুলতা না এলে কিছুই হয় না৷ সাধুসঙ্গ করতে করতে ঈশ্বরের জন্য প্রাণ ব্যাকুল হয়৷

উপায়: সাধুসঙ্গ আর প্রার্থনা৷

সব্বাই মনে করে আমার ঘড়ি ঠিক যাচ্ছে, কিন্তু কারো ঘড়ি ঠিক যায় না৷ তা বলে কারু কাজ আটকায় না৷ ব্যাকুলতা থাকলে সাধুসঙ্গ জুটে যায়, সাধুসঙ্গে নিজের ঘড়ি অনেকটা ঠিক করে লওয়া যায়৷

তা যে কর্মই লোকে করুক না কেন, সংসারী ব্যক্তির মাঝে মাঝে সাধুসঙ্গ বড় দরকার৷ ঈশ্বরে ভক্তি থাকলে লোকে সাধুসঙ্গ আপনি খুঁজে লয়৷

সাধুসঙ্গ সর্বদাই দরকার৷ রোগ লেগেই আছে৷ সাধুরা যা বলেন সেইরূপ করতে হয়৷ শুধু শুনলে কি হবে? ঔষধ খেতে হবে, আবার আহারের কটকেনা করতে হবে৷ পথ্যের দরকার৷

তাই সাধু মহাত্মা যাঁরা ঈশ্বরলাভ করেছেন, তাঁদের কথা বিশ্বাস করতে হয়৷ সাধুরা ঈশ্বরচিন্তা লয়ে থাকেন, যেমন উকিলরা মোকদ্দমা লয়ে থাকে৷

নরেন্দ্র

(চাষারা) ল্যাজের নিচে হাত দিয়ে দেখে৷ কোন গরু ল্যাজে হাত দিলে শুয়ে পড়ে, সে গরু কেনে না৷ যে গরু ল্যাজে হাত দিলে তিড়িং-মিড়িং করে লাফিয়ে উঠে সেই গরুকেই পছন্দ করে৷ নরেন্দ্র সেই গরুর জাত; ভিতরে খুব তেজ৷

দেখ, নরেন্দ্রের কত গুণ—গাইতে, বাজাতে, বিদ্যায়, আবার জিতেন্দ্রিয়, বলেছে বিয়ে করবে না—ছেলেবেলা থেকে ঈশ্বরেতে মন৷

দেখ, নরেন্দ্র গাইতে, বাজাতে, পড়াশুনায়—সব তাতেই ভাল৷ সেদিন কেদারের সঙ্গে তর্ক করছিল৷ কেদারের কথাগুলো কচকচ করে কেটে দিতে লাগল৷

নরেনের গান শুনলে (বুকে হাত দিয়া দেখাইয়া) এর ভিতর যিনি আছেন তিনি সাপের ন্যায় ফোঁস করে যেন ফণা ধরে স্থির হয়ে শুনতে থাকেন৷

নরেন্দ্র কিছুর বশ নয়৷ ও আসক্তি, ইন্দ্রিয়সুখের বশ নয়৷

নরেন্দ্রের অবস্থা কি আশ্চর্য! দেখো, এই নরেন্দ্র আগে সাকার মানত না! এর প্রাণ কিরূপ আটুপাটু হয়েছে দেখছিস৷

মায়া

তিনিই বিদ্যামায়া রেখে গিয়েছেন—লোকের জন্য—ভক্তের জন্য৷

মায়া আবরণস্বরূপ৷ এই দেখ, এই গামছা আড়াল করলাম—আর প্রদীপের আলো দেখা যাচ্ছে না৷

ব্রহ্ম আর মায়া৷ জ্ঞানী মায়া ফেলে দেয়৷ ভক্ত কিন্তু মায়া ছেড়ে দেয় না৷ মহামায়ার পূজা করে৷ শরণাগত হয়ে বলে, ‘মা, পথ ছেড়ে দাও৷ তুমি পথ ছেড়ে দিলে তবে ব্রহ্মজ্ঞান হবে৷’

তাঁর ইচ্ছা যে, তিনি এইসব নিয়ে খেলা করেন৷ বুড়ীকে আগে থাকতে ছুঁলে দৌড়াদৌড়ি করতে হয় না৷ সকলেই যদি ছুঁয়ে ফেলে খেলা কেমন করে হয়?

জীবেরা ত্রিতাপে জ্বলছে, তবু বলে বেশ আছি৷ বেঁকা কাঁটা দিয়ে হাত কেটে যাচ্ছে৷ দরদর করে রক্ত পড়ছে—তবু বলে, ‘আমার হাতে কিছু হয় নাই৷’ জ্ঞানাগ্নি দিয়ে এই কাঁটা তো পোড়াতে হবে৷

ডাক্তার

সেদিন মা দেখালে দুটি লোককে৷ ইনি তার ভিতর একজন৷ খুব জ্ঞান হবে দেখলাম,—কিন্তু শুষ্ক৷ (ডাক্তারকে, সহাস্যে) কিন্তু তুমি রোসবে৷”

দেখ, সিদ্ধ হলে জিনিস নরম হয়—ইনি (ডাক্তার) খুব শক্ত ছিলেন, এখন ভিতর থেকে একটু নরম হচ্ছেন৷

ইনি (ডাক্তার) এখন নেতি নেতি করে অনুলোমে যাচ্ছে৷ ঈশ্বর জীব নয়, জগৎ নয়, সৃষ্টির ছাড়া তিনি, এই সব বিচার ইনি কচ্ছে৷ যখন বিলোম আসবে সব মানবে৷

লজ্জা, ঘৃণা, ভয়—তিন থাকতে নয়৷ ‘আমি এত বড় লোক, আমি ‘হরি হরি’ বলে নাচব? বড় বড় লোক এ-কথা শুনলে আমায় কি বলবে? যদি বলে, ওহে ডাক্তারটা ‘হরি হরি’ বলে নেচেছে৷

শ্রীরামকৃষ্ণ(ডাক্তারের প্রতি)—এই ভাব-টাব যা দেখলে তোমার সায়েন্স কি বলে? তোমার কি এ-সব ঢঙ বোধ হয়?
ডাক্তার—যেখানে এত লোকের হচ্ছে সেখানে natural(আন্তরিক) বোধ হয়, ঢঙ বোধ হয় না৷

যদি টাকা না লয়ে পরের দুঃখ দেখে দয়া করে কেউ চিকিৎসা করে তবে সে মহৎ, কাজটিও মহৎ৷ কিন্তু টাকা লয়ে এসব কাজ করতে করতে মানুষ নির্দয় হয়ে যায়৷

(ডাক্তারকে) কি আশ্চর্য, আমি মূর্খ!—তবু লেখাপড়াওয়ালারা এখানে আসে, এ কি আশ্চর্য! এতে তো বলতে হবে ঈশ্বরের খেলা

ডাক্তার—ভক্তিপথে মানুষ আটকে যায়৷
শ্রীরামকৃষ্ণ— হ্যাঁ, তা যায় বটে, কিন্তু তাতে হানি হয় না, সেই সচ্চিদানন্দ-সাগরের জলই জমাট বেঁধে বরফ হয়েছে৷

ডাক্তার—সব সন্দেহ যায় কই?
শ্রীরামকৃষ্ণ—আমার কাছে এই পর্যন্ত শুনে যাও৷ তারপর বেশি কিছু শুনতে চাও, তাঁর(ঈশ্বর) কাছে একলা একলা বলবে৷ তাঁকে জিজ্ঞাসা করবে কেন তিনি এমন করেছেন৷

(ডাক্তারের প্রতি) শোন৷ তোমার যদি আত্মার সাক্ষাৎকার হয়, তবে এইসব (অবতার, লীলা, ‘আমি’) মানতে হবে৷ তাঁর দর্শন হলে সব সংশয় যায়৷

নিত্য/ লীলা

নিত্যরাধা নন্দ ঘোষ দেখেছিলেন৷ প্রেমরাধা বৃন্দাবনে লীলা করেছিলেন, কামরাধা চন্দ্রাবলী৷

কি জানো—নিত্য আর লীলা দর্শন করে দাসভাবে থাকা৷ হনুমান সাকার-নিরাকার সাক্ষাৎকার করেছিলেন৷ তারপরে, দাসভাবে—ভক্তের ভাবে ছিলেন৷

কচ বললেন, দেখছি যে জগত যেন তাঁতে জরে রয়েছে! তিনিই পরিপূর্ণ! যা কিছু দেখছি সব তিনিই হয়েছেন৷ এর ভিতর কোন্ টা ফেলব, কোন্ টা লব, ঠিক করতে পারছি না৷

অহংবুদ্ধি যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ লীলা ছাড়িয়ে যাবার জো নাই৷

নিত্যকে ছেড়ে শুধু লীলা বুঝা যায় না৷ লীলা আছে বলেই ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে নিত্যে পৌঁছানো যায়৷

মন-বুদ্ধি-আত্মা

শুদ্ধ মন আর শুদ্ধ আত্মা একই! শুদ্ধ মনে যা উঠে, সে তাঁরই কথা৷ তিনিই ‘মাহুত নারায়ণ’৷

চৈতন্য

মানুষ আর মানহুঁশ৷ যার চৈতন্য হয়েছে, সেই মানহুঁশ৷ চৈতন্য না হলে বৃথা মানুষ জন্ম৷

সমাধি

কি একটা হয় আবেশে; এখন লজ্জা হচ্ছে৷ যেন ভূতে পায়, আমি আর আমি থাকি না৷ এ-অবস্থার পর গণনা হয় না৷ গণতে গেলে ১-৭-৮ এইরকম গণনা হয়৷

কুক্ সাহেব যখন এসেছিল, জাহাজে আমার অবস্থা (সমাধি-অবস্থা) দেখে বললে, ‘বাবা! যেন ভূতে পেয়ে রয়েছে’৷

চিত্তশুদ্ধি/সংস্কার

ছোকরারা যেন নূতন হাঁড়ি—পাত্র ভাল—দুধ নিশ্চিন্ত হয়ে রাখা যায়৷ তাদের জ্ঞানোপদেশ দিলে শীঘ্র চৈতন্য হয়৷ বিষয়ী লোকদের শীঘ্র হয় না৷ দই পাতা হাঁড়িতে দুধ রাখতে ভয় হয়, পাছে নষ্ট হয়৷

ছোকরাদের অত ভালবাসি কেন, জান? ওরা খাঁটি দুধ, একটু ফুটিয়ে নিলেই হয়—ঠাকুর সেবায় চলে৷ …জোলো দুধ অনেক জ্বাল দিতে হয়—অনেক কাঠ পুড়ে যায়৷

সেপ্তেম্বর ১৫ পর্যন্ত


This page has been viewed 381 times
Culture of India